মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে সৌদি আরব ও ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে। ইয়েমেনের ভেতরে চলমান সংঘাতে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অস্ত্র প্যাকেজ যোগ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে ৪৮টি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যার মোট মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এই বিক্রি আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তন করবে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি সৌদির আকাশ শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, যা হুতিদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সৌদি আরবের মিত্র পাকিস্তানও এগিয়ে এসেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আহমেদ শরিফ চৌধুরী জানিয়েছেন, তারা কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে রিয়াদকে সমর্থন করবে। তবে গত মাসে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এখন পর্যন্ত পাকিস্তান কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। অন্যদিকে, হুতিদের লাগাম টানতে ইরানকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছে চীন। তবে বেইজিং তেহরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায় এই চাপ কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে বলে মনে করছেন পশ্চিমা কূটনীতিকরা।

ইয়েমেনের ভেতরে লড়াইয়ের চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, গত শুক্রবার তাইজ প্রদেশের আল-ওয়াজিয়াহ জেলায় হুতিদের সঙ্গে তাদের সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হয়। ওই লড়াইয়ে অন্তত ৩০ জন হুতি যোদ্ধা নিহত এবং ৬০ জন আহত হয়েছেন। একই দিন আল-ধিকরা, আল-দামনা ও আল-রাহিদা এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি যুদ্ধবিমানের হামলায় হুতিদের ৪০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছিল বলে এএফপিকে জানিয়েছেন দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা। অন্যদিকে, হুতিদের পাল্টা হামলায় ২৩ জন সরকারি সেনা নিহত হয়েছেন।

হুতিরা ইতিমধ্যে লোহিত সাগরের কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালি ও আশপাশের দ্বীপগুলো দখল করে নিয়েছে। সম্প্রতি মাইয়ুন দ্বীপ, হানিশ দ্বীপ এবং বন্দর শহর মোখা তাদের দখলে চলে গেছে। এতে ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল এখন হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে সৌদি জাহাজ চলাচলে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। হুতির নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি বলেছেন, সানা বিমানবন্দরে সৌদি হামলার পর তারা সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জায়নবাদীরা সৌদি আরবের পক্ষে এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে।

সংঘাতের কারণে মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, লড়াই শুরুর পর অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। প্রায় ৩ হাজার ইয়েমেনি এডেন উপসাগর পেরিয়ে জিবুতিতে পালিয়ে গেছেন। ইরান যুদ্ধের ফলে সমগ্র আরব অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি হয়েছে। জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক অর্থনীতি ও সামাজিক কমিশনের নির্বাহী সচিব রনিয়া আল-মাশাত জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আরব দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে, যা মোট জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ।

এদিকে সৌদি আরবের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। কারণ, রাডার ফাঁকি দিয়ে হামলা চালাতে সক্ষম এই যুদ্ধবিমান এর আগে কেবল ইসরায়েল ও ন্যাটো মিত্রদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। হুতিরা সম্প্রতি সৌদি বিমান বাহিনীর একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করার পরই এই বিক্রির ঘোষণা এল। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, এই বিক্রি আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট করবে না। সব মিলিয়ে ইয়েমেনের সংঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তান, চীনসহ বহু দেশের স্বার্থ জড়িয়ে পড়েছে।