লোহিত সাগরের তীরবর্তী মোখা বন্দরটি হুতি বিদ্রোহীদের দখলে যাওয়ার পর ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘাত নতুন করে তীব্র রূপ নিয়েছে। বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ শহরের নিকটবর্তী কাধা এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি এবং রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মারিব শহরের দিকে হুতিরা অগ্রসর হওয়ায় সেখানেও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে সরকারি বাহিনী। মারিব শহরটি যদি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর অবস্থান আরও নাজুক হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উল্লেখ্য, মারিব এলাকায় সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা বড় তেল ও গ্যাস কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা রয়েছে, যা দেশটির রাজস্ব প্রবাহের অন্যতম প্রধান উৎস।

এদিকে, ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী কেবল ইয়েমেনের ভেতরেই নয়, বরং সৌদি আরবেও তাদের হামলা জোরদার করেছে। গত রোববার তারা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। তাদের মতে, উক্ত ঘাঁটির কমান্ড সেন্টার এবং অস্ত্রের গুদাম লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হয়। অন্যদিকে, হুতিদের দাবি অনুযায়ী, গত ৪৮ ঘণ্টায় সৌদি বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রায় ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে তাইজ ও মারিবের নিকটবর্তী এলাকাগুলোও অন্তর্ভুক্ত। সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জাজান প্রদেশের আল-তুওয়াল এলাকায় হামলার খবর নিশ্চিত করেছে, যেখানে বেশ কিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই সংঘাতের ফলে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। রয়টার্সের সূত্রে জানা গেছে, হুতিদের ড্রোন হামলার কারণে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ 'ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন' বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে ইয়ানবু বন্দরে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের তেল মজুত রয়েছে। এই পাইপলাইন দ্রুত চালু না হলে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি কমতে পারে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আঞ্চলিক উত্তেজনার মাঝে হরমুজ প্রণালির অদূরে কাসেম দ্বীপের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার দাবি করেছে ইরান। এই ঘটনায় একজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। এই সংকটময় পরিস্থিতি নিরসনে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনার জন্য সোমবার ওমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসছে ইরান। তবে বাহরাইন এই বৈঠকে অংশ নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়ারল্যান্ডের ডুনবেগে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, হরমুজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আলোচনার বিষয়ে তাঁর কোনো বিশেষ মতামত নেই, এটি তাদের নিজস্ব বিষয়।

মানবিক দিক থেকে এই যুদ্ধের প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, গত জুলাই মাস থেকে ইয়েমেনের এই নতুন সংঘাতের কারণে প্রায় ৭৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। চলতি সপ্তাহে লোহিত সাগরের পশ্চিম তীরে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন দুই হাজারেরও বেশি মানুষ। ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য ও মারিবের গভর্নর সুলতান আল-আরাদা মোখা ও পশ্চিম উপকূলে সরকারি বাহিনীর পরাজয়কে 'দুঃখজনক' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের হিসাব অনুযায়ী, গত ৯ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পশ্চিম উপকূলে লড়াইয়ে তাদের পাঁচ শতাধিক সেনা নিহত এবং প্রায় দেড় হাজার সেনা আহত হয়েছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা মনে করেন, সরকারপন্থী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক বিভক্তির কারণেই হুতিদের মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।