মিয়ানমারের ভূ-প্রকৃতিতে লুকিয়ে থাকা মূল্যবান খনিজ সম্পদ এখন দেশটির গৃহযুদ্ধের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)-এর একটি বিশেষ ভিজ্যুয়াল অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কীভাবে সোনা, জেড (স্বর্গের পাথর), টিন এবং ভারী বিরল মৃত্তিকার খনিগুলো দেশটির সামরিক জান্তা এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে অস্ত্র কেনা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা তৈরি করে দিচ্ছে। যদিও মিয়ানমারের সংঘাতের মূল কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতা ও জাতিগত স্বায়ত্তশাসন, তবে এই সম্পদের নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধের রসদ জোগাতে বড় ভূমিকা রাখছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টিনের বাজারে মিয়ানমারের প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের 'মান মাও' খনিটি ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (ইউডব্লিউএসএ)-র নিয়ন্ত্রণে। এক সময় চীন তার টিন আকরিকের ৯০ শতাংশের বেশি এখান থেকে আমদানি করত। ২০২৩ সালে সম্পদ নিরীক্ষার দোহাই দিয়ে খনি বন্ধ করায় লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে টিনের দাম ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ডেটা সেন্টার ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির জন্য প্রয়োজনীয় সোল্ডারে টিনের ব্যবহার বাড়ছে, যা এই খনিগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে টিনের দাম টনপ্রতি ৫৩ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় এর সরবরাহ ব্যবস্থা এখন আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোনা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সাগাইং অঞ্চলে সোনা উত্তোলনের হার ১৬০ শতাংশ বেড়েছে। সরকারি হিসাবের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক উৎপাদন ১০ গুণ বেশি হতে পারে, যার বাজারমূল্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার। এই আয়ের একটি বড় অংশ দিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র ও গোলাবারুদ কিনছে, আবার সামরিক জান্তাও ঘুষ ও অনানুষ্ঠানিক করের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছে। তবে এই খনিগুলোর কারণে চিন্দুইন নদীর পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশে উচ্চমূল্যের কারণে সীমান্তপথে সোনার পাচারও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে, কাচিন রাজ্যের হপাকান্ত থেকে আসা উজ্জ্বল সবুজ ‘ইম্পেরিয়াল জেড’ বা ‘স্বর্গের পাথর’ আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে চীনে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এক সময় এই খনিগুলো সরাসরি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ২০২৪ সালে কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন (কেআইও) গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ ও খনি দখল করে নেয়। এই বাণিজ্যের ফলে শত শত কোটি ডলারের লেনদেন হয়, তবে এর বিনিময়ে শ্রমিকদের মাদকাসক্তি ও খনি ধসের মতো মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।
সবচেয়ে কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে ‘ভারী বিরল মৃত্তিকার’ (Rare Earth Elements)। বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের চুম্বক তৈরিতে ব্যবহৃত ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়াম মিয়ানমারে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। চীন নিজস্ব ভূখণ্ডে পরিবেশগত কঠোরতার কারণে খনি বন্ধ করে দেওয়ায় এই উত্তোলন মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় স্থানান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে কেআইও এই খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনের সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ পাচ্ছে। তবে এই উত্তোলনের ফলে বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে, যার প্রভাব থাইল্যান্ড ও লাওস পর্যন্ত পৌঁছেছে।
পরিশেষে, মিয়ানমারের খনিজ সম্পদ এখন একটি জটিল শৃঙ্খলের মতো। একদিকে এটি স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সামরিক জান্তাকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থ দিচ্ছে, অন্যদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে সমরাস্ত্র ও এআই অবকাঠামোর মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তির সরবরাহ ব্যবস্থা এই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।


