দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এখন থেকে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের সকল দাপ্তরিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু মূল দাপ্তরিক ভবনই নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর অধীনস্থ মিলনায়তন, ডাকবাংলো, অতিথিশালা এবং হাট-বাজারের স্থায়ী শেডের ছাদেও এই সোলার প্যানেল বসাতে হবে।

গত ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বরের পৃথক চিঠির মাধ্যমে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যেই এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হবে। তাঁর মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি জনগণের সেবার সঙ্গে যুক্ত, তাই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে যেন এসব সেবা ব্যাহত না হয় তা নিশ্চিত করা জরুরি। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎ খরচ কমবে, অন্যদিকে ব্যাটারি ব্যাকআপের মাধ্যমে জরুরি কাজগুলো নিরবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হবে। এছাড়া উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে এসব প্রতিষ্ঠান নতুন করে রাজস্ব আয় করতে পারবে।

অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে দুটি ভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী, তারা নিজস্ব রাজস্ব বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) অর্থ থেকে এই ব্যয় নির্বাহ করবে। আর যেসব প্রতিষ্ঠান স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, তারা বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানির কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, যা জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির নির্দেশিকা অনুযায়ী হতে হবে। এছাড়া প্যানেল স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরবর্তী ২০ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের ১ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে বিশেষ প্রণোদনা পাওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা প্রদান করা হবে। এই বিশেষ মূল্য সুবিধা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে এবং বিক্রিত বিদ্যুতের টাকা প্রতি তিন মাস অন্তর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।

বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কিছু সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্যানেল স্থাপনের আগে ছাদের কারিগরি সক্ষমতা যাচাই এবং সর্বোচ্চ মানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট ও লোকবল নিয়োগের পাশাপাশি একটি তদারকি সেল গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি, যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের সঠিক হিসাব রাখা সম্ভব হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত হবে।