ইথিওপিয়ার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত টিগ্রায় অঞ্চলের গভীরে ইরিত্রিয়ার সৈন্যরা প্রবেশ করেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা বিবিসি-কে জানিয়েছেন। বিশেষ করে আদিগ্রাত শহরের বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরিত্রীয় সামরিক বাহিনী সেই সব এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে যেখানে ইথিওপিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনী এবং আঞ্চলিক বাহিনীর মধ্যে বর্তমানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে।

গত দুই সপ্তাহ আগে এই অঞ্চলে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়। মূলত ইথিওপিয়া সরকার এবং টিগ্রায় পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের (টিপিএলএফ) মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এই সংঘাতের মূল কারণ। ২০২২ সালে দুই বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সেই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করার অভিযোগ তুলেছে। সম্প্রতি টিপিএলএফ-সহ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটি নতুন জোট গঠিত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। গত সপ্তাহান্তে টিপিএলএফ বাহিনী টিগ্রায়ের প্রধান শহর মেকেলে থেকে পিছু হটেছে এবং বর্তমানে শহরটি জাতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

আদিগ্রাতের বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, সীমান্ত শহর জালামবেসা থেকে ইরিত্রিয়ার সৈন্যরা মধ্য টিগ্রায়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, তিনি প্রায় ৪০টি ট্রাকের একটি কনভয় দক্ষিণ দিকে যেতে দেখেছেন। আরেক বাসিন্দার মতে, ইরিত্রীয় রেজিস্ট্রেশন প্লেটযুক্ত ২০ থেকে ৩০টি বড় ট্রাককে এডাগা হামুসের দিকে যেতে দেখা গেছে। এছাড়া ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান এবং পায়ে হেঁটে চলা সৈন্যদের উপস্থিতির খবরও পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবিতেও ইউনিফর্ম পরিহিত সদস্যদের সামরিক ট্রাকে করে আদিগ্রাত, এডাগা হামুস এবং উক্রো শহরের দিকে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, যদিও বিবিসি স্বতন্ত্রভাবে এই ছবিগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

ইরিত্রিয়ার এই প্রত্যাবর্তনে টিগ্রায়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পূর্বের গৃহযুদ্ধের সময় ইরিত্রীয় সৈন্যদের দ্বারা সংঘটিত অমানবিক নির্যাতনের স্মৃতি স্থানীয়দের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এডাগা হামুসের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, ইরিত্রীয় সেনা চলাচলের পাশাপাশি ওই এলাকায় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে এবং লক্ষ্যবস্তু ছিল সৈন্যরা।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ২০২০-২০২২ সালের যুদ্ধে ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার প্রধান মিত্র হিসেবে টিপিএলএফ-এর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। তবে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রীর লাল সাগর উপকূলের একটি বন্দর দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহে তারা কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।

ইথিওপিয়ার সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আব্রাহাম বেলায়ে ফানা টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে ইরিত্রিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, ইরিত্রিয়া তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে এই সংঘাতে অংশ নিয়েছে। অনেক ইরিত্রীয় সৈন্য নিহত ও বন্দী হয়েছে বলে দাবি করে তিনি সতর্ক করেন যে, অন্য দেশের সীমানায় ঢুকে দস্যুদের সাথে লড়াই করার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। বর্তমানে উত্তর ইথিওপিয়া জুড়ে জাতীয় সেনাবাহিনী এবং বিদ্রোহী যোদ্ধাদের মধ্যে লড়াই চলছে, যার প্রভাব পাশের অঞ্চলগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে এবং লালিবেলার মতো পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকরা আটকা পড়েছেন।