বর্তমান সময়ে একই ছাদের নিচে বসবাস করেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্বের প্রবণতা বাড়ছে। প্রযুক্তির আধিক্য এবং যান্ত্রিক জীবনযাপন দম্পতিদের একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে, যেখানে কথা হয় কেবল প্রয়োজনীয় সাংসারিক হিসাব-নিকাশ নিয়ে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পবিত্র কোরআনের সুরা রুমের ২১ নম্বর আয়াতে দাম্পত্য জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে প্রশান্তি, ভালোবাসা এবং দয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলাম অনুযায়ী, বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য কেবল দায়িত্ব পালন নয়, বরং একে অপরের মাঝে মানসিক শান্তি খুঁজে পাওয়া।

একটি সুন্দর ও টেকসই দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে ইসলামের নির্দেশিত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

প্রথমত, পরিবারের প্রতি উত্তম আচরণ। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় তার পারিবারিক আচরণের মাধ্যমে। মহানবী (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, যে ব্যক্তি তার পরিবারের কাছে সবচেয়ে ভালো ব্যবহার করে, সেই প্রকৃত অর্থে সর্বোত্তম মানুষ। বাইরের জগতের সাথে ভালো ব্যবহার করলেও ঘরে সেই আচরণের প্রতিফলন না থাকলে তাকে পূর্ণাঙ্গ ভালো মানুষ বলা যায় না।

দ্বিতীয়ত, জীবনসঙ্গীর খামতি বা ত্রুটিগুলোকে মেনে নেওয়া। মানুষ হিসেবে কেউই নিখুঁত নয়, তাই সঙ্গীর কোনো নির্দিষ্ট স্বভাব অপছন্দ হলে তার অন্য কোনো ভালো গুণ খুঁজে বের করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পারস্পরিক দোষ-ত্রুটির দিকে নজর না দিয়ে ইতিবাচক দিকগুলোকে গুরুত্ব দিলে সংসারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।

তৃতীয়ত, ঘরের কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ। সাংসারিক কাজ কেবল একজনের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.) নামাজের আগে নিজের পরিবারের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত থাকতেন, যা দম্পতিদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়িয়ে দেয়।

চতুর্থত, সদাচরণ ও সৌজন্যবোধ বজায় রাখা। সুরা নিসায় আল্লাহ তাআলা জীবনসঙ্গীর সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, ইসলামে ভালো ব্যবহার বজায় রাখা ঐচ্ছিক নয় বরং বাধ্যতামূলক। মন খারাপ থাকলেও সঙ্গীর প্রতি নম্রতা বজায় রাখা সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি করে।

পঞ্চমত, একে অপরের গোপনীয়তা রক্ষা ও রক্ষাকবচ হওয়া। সুরা বাকারায় স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের 'পোশাক' হিসেবে তুলনা করা হয়েছে। পোশাক যেমন শরীরকে ঢেকে রাখে এবং সুরক্ষা দেয়, তেমনি দম্পতিদের দায়িত্ব হলো একে অপরের দুর্বলতা ও দোষ-ত্রুটি অন্যের কাছে প্রকাশ না করে আগলে রাখা।

দাম্পত্য জীবনকে আনন্দময় করতে মহানবী (সা.)-এর ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ অত্যন্ত শিক্ষণীয়। নবুয়তের কঠিন দায়িত্ব পালন করেও তিনি স্ত্রী হযরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতার মতো খুনসুটির মাধ্যমে সময় কাটাতেন। এটি প্রমাণ করে যে, কঠোর নিয়মের পাশাপাশি সংসারে হাসি-তামাশা ও আন্তরিকতার প্রয়োজন রয়েছে। বড় কোনো আয়োজনের চেয়ে সামান্য প্রশংসা, চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা এবং ফোন দূরে সরিয়ে গুণগত সময় কাটানোই জীবনসঙ্গীকে সুখী করার সহজ উপায়।