মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনায় এক অসম যুদ্ধের চিত্র উঠে এসেছে পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। ইরান যখন আকাশে পাঠাচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৫০ হাজার ডলার মূল্যের সহজলভ্য ড্রোন, তখন তাদের ঠেকাতে আমেরিকা ছুড়ছে কোটি কোটি ডলারের অত্যাধুনিক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র। ফলে আমেরিকার অস্ত্র মজুদ উদ্বেগজনক হারে কমে যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
'অপারেশন এপিক ফিউরি' নামের এই সামরিক অভিযানে গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত মোট অস্ত্র ব্যয় হয়েছে ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, যা পুরো অভিযানের মোট খরচের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। সম্পূর্ণ যুদ্ধ পরিচালনায় মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে। পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলের প্রতিবেদনে 'কৌশলগত মজুদ ঘাটতি' এবং 'গোলাবারুদ পুনঃপূরণে শিল্পখাতের সক্ষমতার ঘাটতি'র কথা সরাসরি স্বীকার করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও দাবি করেছেন যে অস্ত্র মজুদ 'কার্যত সীমাহীন', কিন্তু ইন্সপেক্টর জেনারেলের পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। গত কয়েক মাসে আমেরিকা ইরানের ড্রোনের বিরুদ্ধে দেড় হাজারেরও বেশি ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করেছে। বর্তমানে গুদামে মজুদ রয়েছে আটশ'রও কম। এছাড়া থাড সিস্টেমের প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যবহার হয়ে গেছে, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমেছে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
উৎপাদন ক্ষমতার দিক থেকেও দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের ব্যবধান। লকহিড মার্টিন বছরে মাত্র ৯৬টি থাড উৎপাদন করতে পারে, অন্যদিকে রেথিয়নের টমাহক উৎপাদন capacity প্রায় ২০০ ইউনিট। নতুন করে অর্ডার দিলে সেই গোলাবারুদ হাতে পেতে সময় লাগবে কমপক্ষে ৩৪ মাস। ইরানের পক্ষ থেকে সস্তা ড্রোন পাঠানো অব্যাহত থাকলে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ আরও দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আমেরিকা এশিয়া ও ইউরোপের সামরিক গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্য অঞ্চলের অস্ত্র মজুদ খালি করা দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, রকেটমোটর, উন্নত বিস্ফোরক এবং দক্ষ জনবলের অভাব এখন পেন্টাগনের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও পেন্টাগন বলছে, তারা উৎপাদন সময় কমাতে সক্ষম হবে, কিন্তু একই সঙ্গে স্বীকার করেছে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও যন্ত্রাংশ সরবরাহে 'উল্লেখযোগ্য সময়ের ব্যবধান' রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের কৌশলটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। সস্তা ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে তারা আমেরিকার বিশাল সামরিক ব্যয়ের কাঠামোতে ফাটল ধরিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আজ নিজেদের প্রতিবেদনেই জানাচ্ছে গোলাবারুদ সংকটের কথা। ইরান যেন বার্তা দিচ্ছে, শুধু শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, এ যুদ্ধ এখন খরচের হিসাব-নিকাশেরও লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।




