পাল্টা অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদি ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত রাষ্ট্রগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো ধরনের তেল রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এক ফোঁটা তেলও বের হতে দেবে না ইরান। তাঁর ভাষ্যমতে, ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যেকোনো দেশের অংশগ্রহণ বা সমর্থনকে সরাসরি ‘যুদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করা হবে।

এই হুমকির পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপ। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আজ সোমবার ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সময় রাত এগারোটায় ওয়াশিংটন সময় বেলা ১টায় তাঁর সংবাদ সম্মেলনের কথা রয়েছে, যেখানে আরও কঠোর ব্যবস্থার বিস্তারিত আসতে পারে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বেসেন্ট লিখেছেন, ‘ভোরে শুরু হবে অর্থনৈতিক ডি-ডে’—যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর নরম্যান্ডি অভিযানের সঙ্গে তুলনীয়। তাঁর মতে, এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান এটি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়ে আসছে তেহরান।

গত ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের কোনো রাজনৈতিক সমাধান এখনো হয়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক হামলা শুরু করে। এরপর থেকে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে; নিহতদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতিও গুরুতর ধাক্কা খেয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই হামলায় নিহত হন। তবে ইরানের হাতে এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের যথেষ্ট মজুত রয়েছে, যা দিয়ে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর আক্রমণ চালানো সম্ভব। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ইতিমধ্যেই প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী।

নতুন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য দেশও মার্কিন পদক্ষেপের আওতায় আসতে পারে। তিনি বলেন, এসব দেশ ‘ভীত’ এবং ইরানকে ‘তোষণ’ করছে। তাদের বিবেচনা করা উচিত যে ইরানের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার পরিণতি কী হতে পারে। এর আগে তিনি চীনকে আহ্বান জানান, যেন যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করে। ঐতিহাসিকভাবে চীন তার আমদানি করা তেলের প্রায় অর্ধেক উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে। জবাবে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সমস্যার সমাধান দেবে না।’ তিনি কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দেন।

পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা এখনো অস্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে চায়। কয়েক সপ্তাহ ধরে সরাসরি সামরিক হামলা থেকে দুই পক্ষ বিরত থাকলেও ছয় মাসের সংঘাতের অবসান হয়নি। যুদ্ধ শুরুর আগেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি চাপে ছিল। হামলায় দেশটির অবকাঠামোর কিছু অংশ ধ্বংস হয়েছে। এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা, জ্বালানিসংকট, উৎপাদন হ্রাস ও পুনর্গঠনের বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্য বাধা।

তেহরান প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান ধরে রাখলেও দেশটির কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে বিক্ষোভের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে। সর্বশেষ সরাসরি আলোচনা গত জুনে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। ইরান জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির আজ তেহরান সফর করবেন। এই সফরকে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

যুদ্ধের সময় ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের ১৮ জন সেনা নিহত ও ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।