একটি ছোট বাজার থেকে রুটি কিনতে বেরিয়েছিলেন সাহিদা ফকির। কিন্তু সেই সাধারণ রাতটিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের চরম দুঃস্বপ্নের সূচনা। সাদাপোশাক পরিহিত একদল লোক নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাঁকে আটক করেন। সাহিদার কাছে জন্মসনদ, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড এবং নিজের নামে জমির দলিলসহ নাগরিকত্বের যাবতীয় প্রমাণপত্র ছিল। এমনকি তাঁর বাবা ও দাদার নামও সরকারি তালিকায় নথিভুক্ত ছিল। তবে রাষ্ট্র এসব প্রমাণকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল তাঁর মুখে বাংলা ভাষার ব্যবহারের ভিত্তিতে তাঁকে 'সন্দেহভাজন বাংলাদেশি' হিসেবে চিহ্নিত করে।

কোনো ম্যাজিস্ট্রেট বা আইনি শুনানির সুযোগ না দিয়েই সাহিদা ফকিরকে টানা পাঁচ দিন আটকে রাখা হয়। তাঁর নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি এবং কোনো আদালতের আদেশপত্র ছাড়াই এক নিঃশব্দ সিদ্ধান্তে তাঁকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এরপর বিমান ও গাড়ির মাধ্যমে তাঁকে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ১টার দিকে আরও ২০ জনের সাথে অন্ধকারে তাঁকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। খালি পেটে এবং ফাটা মাটিতে আট ঘণ্টা হাঁটার পর এক দয়ালু বাংলাদেশি কৃষকের আশ্রয় পান তিনি। রাষ্ট্র যেখানে নিজের নাগরিককে চিনতে ব্যর্থ হয়, সেখানে এক অপরিচিত মানুষের মানবিকতা তাঁকে রক্ষা করে।

এই অমানবিক ঘটনার পর সাহিদার ছেলে শাহিন ফকির সুপ্রিম কোর্টে একটি 'হেবিয়াস করপাস' মামলা দায়ের করেছেন। আদালত এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রশ্ন করেছে, কীভাবে একজন নারীকে এভাবে বাজার থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো। পাশাপাশি মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে বাংলাদেশি ঘোষণা করা হলো এবং কোন আইনের অধীনে রাতের অন্ধকারে মানুষকে এভাবে সীমান্তে ছেড়ে দেওয়া যায়।

সরকার এখন ফাইল ঘেঁটে উত্তর খুঁজবে, কিন্তু যে সময়ে রাষ্ট্র আইনি জটিলতায় ব্যস্ত থাকে, সেই সময়ে অসহায় নারী ও শিশুরা নো ম্যানস ল্যান্ডের কাঁটাতারের মাঝে চরম অনিশ্চয়তায় ভোগে। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা বা পতাকার আশ্রয় নেই; আছে কেবল ক্ষুধা, লজ্জা এবং চরম নিরাপত্তাহীনতা। খাবার খুঁজে পাওয়া থেকে শুরু করে মলত্যাগের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেও তাঁদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। ধরা পড়ার ভয়ে তাঁরা মাঠের আড়ালে বা বৃষ্টির কাদায় আশ্রয় নেন। বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের মাঝখানের সীমান্তটি সাহিদা ও তাঁর সন্তানদের আলাদা করে দিয়েছে। সাহিদা এখন অন্য দেশের মাটিতে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, তিনি ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও তাঁর নিজের দেশ তাঁকে চিনতে পারেনি। সুপ্রিম কোর্টের পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও, নো ম্যানস ল্যান্ডের সেই বিভীষিকাময় রাত আর ক্ষুধার যন্ত্রণা কোনো আইনি ফাইলে লেখা থাকে না।