শক্তি খাতের সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো— পারস্য উপসাগর থেকে আসলে কতটুকু তেল বের হচ্ছে। এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে ইরান যুদ্ধের স্থায়িত্ব। ইরান দাবি করছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং এই সংকীর্ণ জলপথটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর আগে এই জলপথ দিয়ে দৈনিক গড়ে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল যাতায়াত করত। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই ধারণা নাকচ করে দিয়েছে। মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বলেছেন, মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় প্রণালী দিয়ে ১৫ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন করা হয়েছে, যদিও সাত দিনের গড় ছিল ৮ মিলিয়ন ব্যারেল। পাইপলাইনে রপ্তানি করা তেল যোগ করলে এই অঞ্চল থেকে মোট যে তেল বের হচ্ছে তা ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের কাছাকাছি, শুক্রবার এক্স-এ পোস্ট করে জানান তিনি। অন্যদিকে, অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওমানের উপকূল ধরে মার্কিন সামরিক বাহিনী যে করিডোর তৈরি করেছে, সেটি দিয়ে দৈনিক প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে। গত মাসে টানা দুই সপ্তাহের মার্কিন বোমাবর্ষণে ইরানের রাডার ও সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থার সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ট্যাংকারগুলো রাতে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে নজর এড়িয়ে যাতায়াত করতে পারছে। জাহাজগুলো শাটল চলাচল করে তেল খালাস করছে অন্য ট্যাংকারে, যেগুলো সেই পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। শুক্রবার সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এনার্জি ইন্টেলিজেন্স ফার্ম ভর্টেক্সার প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড ওয়েচ জানান, গত এক মাসে দৈনিক গড়ে ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। তবে সাত দিনের গড় হিসেবে সর্বোচ্চ পরিমাণ প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল এবং সর্বোচ্চ দিনে ১৪ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে। যাইহোক, এর অর্থ হলো— উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল সরবরাহ বের হচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালী আসলে পুরোপুরি বন্ধ নয়। তবে সরবরাহ ঘাটতি এখনো আছে, যার কারণে ভোক্তা দেশগুলোকে মজুত থেকে তেল তুলতে হচ্ছে, যা সংকটজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। পাশাপাশি, মার্কিন নৌ-অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি আটকে রেখেছে। কিন্তু উপসাগর থেকে যে পরিমাণ তেল বের হচ্ছে, তা বিশ্ববাজার চরম সংকটে পড়ার আগেই আরও সময় কিনে দিচ্ছে— এবং এটি যুদ্ধকে দীর্ঘায়িতও করতে পারে, কারণ দুই পক্ষই অচলাবস্থায় রয়েছে। “তেল বের হতে থাকলে দীর্ঘ যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ে, সম্ভবত ২০২৭ সাল পর্যন্তও। তেলের দাম না বাড়লে এবং ইরান শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার মতো আয় করতে থাকলে কোনো পক্ষই জরুরি বোধ করবে না,” গত সপ্তাহের এক নোটে লিখেছেন অ্যালপাইন ম্যাক্রোর প্রধান ভূ-রাজনৈতিক কৌশলবিদ ড্যান আলামারিউ। সম্প্রতি কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি নেই, কারণ ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অগ্রহণযোগ্য দাবি তুলেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প চান ইরান প্রণালীটির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিক, যা তাদের মূল দর কষাকষির হাতিয়ার। একই সঙ্গে ট্রাম্প পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়িয়ে চলেছেন, বিশেষ করে গোলাবারুদের মজুত কম থাকায়, এবং অর্থনৈতিক চাপের ওপর নির্ভর করছেন। আলামারিউ বর্তমান পরিস্থিতিকে “পরিচালিত বিশৃঙ্খলা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে হরমুজের অবরোধ কিছুটা শিথিল, মাঝে মাঝে সামরিক উত্তেজনা এবং হুমকির পাল্টা হুমকি চলছে। তবে ইরানের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং শাসনব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ায় তীক্ষ্ণ সংকটের সময় আসতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। “প্রণালীটি যদি পুরোপুরি বন্ধ না হয়, তাহলে ইরানের দর কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল। ফলে ইরানের সংঘাত বাড়ানোর কারণ আছে,” মন্তব্য করেন আলামারিউ। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলো ইরানের জন্য একটি সুযোগ— তেলের দাম বাড়িয়ে ট্রাম্পকে কষ্ট দেওয়া এবং কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ভোটারদের অসন্তোষ বাড়ানো, সতর্ক করেছেন তিনি। এতে মার্কিন প্রতিশোধ ও আরও সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ট্রাম্প অবরোধ বজায় রাখতে পারেন এবং যতক্ষণ ব্রেন্ট ক্রুড ৯০-১০০ ডলারের নিচে থাকবে, ততক্ষণ ভালো পরিস্থিতি আশা করতে পারেন। তবে তেল ১০৫-১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে উচ্চ জ্বালানি খরচ ও মুদ্রাস্ফীতি যুক্তরাষ্ট্রকে জোর করে প্রণালী খুলে দিতে বা ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা আরও ধ্বংস করতে বাধ্য করতে পারে। “এগুলো যান্ত্রিক ট্রিগার নয়, তবে সহিংসতার মাধ্যমে তেলের দাম আপনা-আপনি সামঞ্জস্য হতে পারে,” যোগ করেন তিনি। বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন থিংক ট্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এসফান্দিয়ার বাতমাঙেলিজ বলেন, ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বের চোখে অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাতের মধ্যে পার্থক্য মুছে দিয়েছেন। তেহরান ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চাপের ওপর নির্ভরতাকে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করার অনীহা হিসেবে ব্যাখ্যা করছে, এক্স-এ এক পোস্টে মন্তব্য করেন তিনি। “ইরানের নেতারা আক্রমণে যেতে আত্মবিশ্বাসী, কারণ তারা অর্থনৈতিক চাপের এই পরিবর্তনকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখছে। তারা বিশ্বাস করে, আরও কয়েকটি আঘাত হানতে পারলে ট্রাম্প পরাস্ত হয়ে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে ফিরে আসবেন,” লিখেছেন বাতমাঙেলিজ।
ইরান যুদ্ধ ২০২৭ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে: হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ নয়, তবে বড় সংঘাতের আশঙ্কা
ইরান যুদ্ধ কতদিন চলবে তা নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে কত তেল বের হচ্ছে তার ওপর। প্রণালীটি পুরোপুরি বন্ধ নয়, ফলে তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ ২০২৭ সাল পর্যন্ত টানতে পারে এবং বড় ধরনের সংঘাতের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।




