বিআইএফএফএলের সাবেক প্রধান নির্বাহী এস এম ফরমানুল ইসলাম ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই ওই প্রতিষ্ঠানের ৮০তম পর্ষদ সভায় তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। আসামিরা তাঁর জামার কলার ধরে টানাহেঁচড়া করেন এবং মারধর করেন। পরবর্তীতে প্রাণনাশের হুমকি দেখিয়ে জোরপূর্বক তাঁর কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর দাপ্তরিক মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল ব্যবহারে বাধা দেওয়া হয় এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ির চাবি কেঁড়ে নেওয়া হয়। এমনকি তাঁকে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয়েছিল বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
মামলার তদন্তে উঠে আসে, ফরমানুল ইসলাম যখন প্রতিষ্ঠানটির সিইও ছিলেন, তখন তাঁকে সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিপুল অঙ্কের ঋণ ও বিনিয়োগ-সুবিধা দিতে অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। বিশেষ করে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন ‘তিস্তা সোলার’ প্রকল্পের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন ডলার—যা প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার সমান—ঋণ ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়। নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় ফরমানুল ইসলাম তাতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর তাঁর ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ২০০ কোটি টাকার জিরো কুপন বন্ডে আগাম বিনিয়োগ এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো প্রকার জামানত ছাড়াই শতকোটি টাকার ঋণ ছাড়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়। তবে সিআইবির প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত জটিলতা থাকায় সেই প্রস্তাবেও তিনি সম্মতি দেননি।
জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মারধর, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের এসব অভিযোগ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদ রানা ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রতিবেদন জমা দেন। এতে সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারসহ মোট ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এর আগে গত ১৭ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তার দাখিল করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। আদালত অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। কিন্তু আসামিরা আদালতে হাজির না হওয়ায় পরবর্তীতে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
এই মামলার তদন্তে প্রাপ্ত ছয় আসামির মধ্যে প্রধান আসামি আব্দুর রউফ তালুকদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, বিআইএফএফএলের সাবেক কোম্পানি সচিব মো. মনিরুল ইসলাম খান ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ইতোমধ্যে জামিন পেয়েছেন। মামলার ৩ নম্বর আসামি মনিরুল ইসলাম খান ও ৫ নম্বর আসামি খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাঁদের জামিন মঞ্জুর করা হয়। পরে গত বৃহস্পতিবার আরও দুজন জামিন লাভ করেন। সর্বশেষ আজ সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলমের আদালত শুনানি শেষে সালমান এফ রহমানের জামিন মঞ্জুর করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. সজিবুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, মামলাটির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। অধিকাংশ ধারায় জামিনযোগ্য হওয়ায় আদালত তাঁর জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেন বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে মামলার অপর আসামি বিমান বাংলাদেশের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব সাজ্জাদুল হাসান এখনও পলাতক অবস্থায় রয়েছেন। মামলার বাদী এস এম ফরমানুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দণ্ডবিধির যেসব ধারায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো জামিনযোগ্য। তাই জামিন পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু তাঁর মতে দুঃখজনক বিষয় হলো, বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত আসামিদের পক্ষে বর্তমান সরকারি দলের নেতৃস্থানীয় উকিলরা মামলা পরিচালনা করছেন। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও নির্বিকার ভাব নিয়ে বসে আছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, তালুকদার ও মুনিমের জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার কথা সবার জানা ছিল। কিন্তু এই মামলায় আদালতে হাজির হয়ে তাঁরা প্রমাণ করলেন যে তাঁরা দেশেই ছিলেন।




