যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজে ১৯৭০ সালের ৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণকারী ম্যাট ডেমন আজ ৫৬ বছরে পদার্পণ করলেন। শৈশব থেকেই অভিনয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ থাকলেও বড় পর্দায় তাঁর পথচলা ছিল অত্যন্ত বন্ধুর। অভিনয়ের স্বপ্নকে সামনে রেখেই ১৯৮৮ সালে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়তে ভর্তি হন। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সবসময়ই অভিনয়ের সুযোগ খুঁজেছেন। হার্ভার্ডের আমেরিকান রেপার্টরি থিয়েটারের সাথে তাঁর পরিচয় অভিনয়ের আকাঙ্ক্ষাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ১৯৯৩ সালের বসন্তে 'রাইজিং সান' এবং 'স্কুল টাইস'-এর মতো কাজে সুযোগ পাওয়ায় তিনি ঝুঁকি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে হলিউডের পথে পা বাড়ান। যদিও হার্ভার্ড তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, কিন্তু ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে তিনি সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে 'হার্ভার্ড আর্টস মেডেল' দিয়ে সম্মানিত করে।
হলিউডে প্রবেশের পর দ্রুত সাফল্য আসেনি। দীর্ঘ সময় ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় এবং অডিশনের অপেক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে। এই কঠিন সময়ে তাঁর সবচেয়ে বড় অবলম্বন হয়ে ওঠেন শৈশবের বন্ধু বেন অ্যাফ্লেক। তাঁরা উপলব্ধি করেন যে, নতুন অভিনেতা হিসেবে বড় সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষা না করে নিজেদের পথ নিজেরাই তৈরি করা শ্রেয়। হার্ভার্ডের একটি চিত্রনাট্য ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট থেকে শুরু হওয়া একটি খসড়া ভাবনাকে তাঁরা পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। মজার বিষয় হলো, 'প্রাইমাল ফিয়ার' সিনেমায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র না পাওয়ার হতাশা তাঁদের এই চিত্রনাট্য লেখার তাড়না বাড়িয়েছিল। এই প্রচেষ্টার ফসল ছিল 'গুড উইল হান্টিং' সিনেমাটি। ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিতে এমআইটির এক মেধাবী কিন্তু মানসিক সংকটে থাকা তরুণ উইল হান্টিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন ডেমন। ১৯৯৮ সালের অস্কারে মাত্র ২৭ বছর বয়সে বেন অ্যাফ্লেকের সাথে যৌথভাবে সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যের পুরস্কার জিতে নেন তিনি এবং সেরা অভিনেতার মনোনয়ন পান।
এই একটি সিনেমা তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেন। স্টিভেন স্পিলবার্গের 'সেভিং প্রাইভেট রায়ান' ছবিতে তাঁর কাজ সমালোচকদের নজর কাড়ে। ২০০২ সালে 'দ্য বর্ন আইডেন্টিটি'র মাধ্যমে তিনি নিজেকে একজন বাস্তবধর্মী অ্যাকশন তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। জেসন বোর্ন চরিত্রটি তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে। এছাড়া মার্টিন স্করসেসির 'দ্য ডিপার্টেড' সিনেমায় অপরাধ চক্রের হয়ে কাজ করা পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অনবদ্য। ২০১৫ সালে 'দ্য মার্শিয়ান' সিনেমায় মঙ্গল গ্রহে একা আটকে পড়া বিজ্ঞানীর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি গোল্ডেন গ্লোব জয় করেন এবং অস্কার মনোনয়ন পান।
অভিনয়ের পাশাপাশি ম্যাট ডেমন প্রযোজনা ক্ষেত্রেও সমানভাবে সফল। বন্ধু বেন অ্যাফ্লেকের সাথে তাঁর পেশাদার অংশীদারিত্ব বর্তমানে 'আর্টিস্ট ইকুইটি' নামক একটি বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের রূপ নিয়েছে। বর্তমানে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৭ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৭৪ কোটি টাকা। এই বিপুল সম্পদের উৎস হলো তাঁর অভিনয়, প্রযোজনা এবং সিনেমার মুনাফায় অংশীদারিত্ব।
সাফল্যের পাশাপাশি মানবিক কাজের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। ২০০৬ সালে তিনি 'এইচটুও আফ্রিকা' নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেন, যা পরে 'ওয়াটারডটওআরজি' সংস্থায় রূপান্তরিত হয়। এই সংস্থার মূল লক্ষ্য হলো নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সুযোগ বাড়ানো। এভাবে একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র থেকে অস্কারজয়ী তারকা এবং কোটিপতি প্রযোজক হয়ে ওঠা ম্যাট ডেমনের গল্পটি মূলত নিজের সুযোগ নিজে তৈরি করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।




