ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত প্রায় ছয় মাস ধরে চললেও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে তেমন বড় ধাক্কা দেখা যায়নি। যুদ্ধ শুরুর সময় যে পরিমাণ তেলসংকটের আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা এখনো বাস্তবে পরিণত হয়নি। মূলত তিনটি কারণে বাজারটি মোটামুটি স্বাভাবিক আছে—হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে তেল পরিবহন, বিভিন্ন দেশের মজুত থেকে সরবরাহ এবং বৈশ্বিক চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়া। তবে এই ভারসাম্য বেশ নড়বড়ে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জেপি মরগ্যানের প্রধান পণ্যবাজার বিশ্লেষক নাতাশা কানেভা বলেছেন, হরমুজ এড়িয়ে তেল পাঠানোর বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ইরানের নাগালের বাইরে থাকা বন্দরে পাঠাচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর যৌথ সামরিক পাহারায় প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে। তবে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাম্প্রতিক বিজয় এই বিকল্প পথগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, গায়ানা ও কানাডা মিলে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত উৎপাদন করছে। কানেভার ভাষ্য, তেলের ব্যারেলগুলো শেষমেশ কোনো না কোনো পথ খুঁজে নেয়।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছাড়া অধিকাংশ দেশ তাদের মজুত থেকে তেমন একটা তেল ব্যবহার করেনি। ফলে প্রয়োজনের সময় বাজারে সরবরাহ করার মতো উল্লেখযোগ্য মজুত এখনো আছে। তৃতীয়ত, যুদ্ধের সময়ে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমে গেছে। ভ্রমণ হ্রাস, গণপরিবহন ব্যবহার ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠানে অফিসে কাজের ধারা ফিরে আসায় চাহিদা কমেছে। মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া ও চীনের তেল পরিশোধনাগারগুলোর সক্ষমতার ঘাটতিও অপরিশোধিত তেলের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল সরবরাহ কমলেও চাহিদা ৫০ লাখ ব্যারেল কমায় বাজারে একধরনের নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।

তবে এই ভারসাম্য কতদিন বজায় থাকবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। জেপি মরগ্যানের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম শেষ পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৭ ডলারে স্থিতিশীল হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলে তা ৬৪ ডলারে নামতে পারে। কিন্তু র‌্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর পূর্বাভাস, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না। সে ক্ষেত্রে আগামী বছর ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৯ ডলারে পৌঁছাতে পারে। ম্যাকনালির মতে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ অঞ্চল ঝুঁকির মধ্যে থাকলে তেল ও গ্যাসের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও তীব্র হবে।

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তেলের মজুত। যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার কুশিংয়ে জুলাই মাসে মজুত পরিচালনাগত ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। সম্প্রতি তা কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আবার সংকট দেখা দিতে পারে। চীনের আমদানিও যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ের চেয়ে এখনো কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল কম। দেশটির সরকারি মজুতের প্রকৃত পরিমাণ জানা না গেলেও ধারণা করা হচ্ছে, হাতে প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের পণ্যবাজার অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসাইন সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে একপর্যায়ে এসব মজুত শেষ হয়ে যাবে। তখন সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়ে দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান পিকারিং মনে করেন, মজুত কমলেই যে সঙ্গে সঙ্গে দাম লাফিয়ে বাড়বে, তা নয়। তবে বাজারে অস্থিরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। তাঁর ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এ ঝুঁকি চলতি বছর নয়, বরং আগামী বছরের শেষ দিকে বেশি স্পষ্ট হতে পারে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্প পাইপলাইন রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব নয়। একইভাবে ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর অতিরিক্ত উৎপাদন দিয়েও দীর্ঘমেয়াদে ঘাটতি পূরণ সম্ভব হবে না।

তেলবাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা। রয়্যাল ব্যাংক অব কানাডার বৈশ্বিক পণ্যবাজার বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফটের মতে, বাজারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়, বরং মার্কিন সামরিক শক্তিই এখন তেল সরবরাহ সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাও সীমাহীন নয়। দীর্ঘদিন ধরে তেলবাহী জাহাজ পাহারা দেওয়া ব্যয়বহুল এবং কঠিন কাজ। তিনি ২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার উদাহরণ টেনে বলেন, ওই সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল।

বড় এক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত সম্ভবত ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ রূপ নিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে অস্বস্তি থাকলেও একপর্যায়ে সবাই এটিকে নতুন বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেবে। মার্কিন সরকারি সংস্থাগুলোও দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকটের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) জানিয়েছে, বছরের বাকি সময়জুড়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি সীমিত থাকবে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি আরও সতর্ক পূর্বাভাস দিয়েছে—আগামী বছরের শেষ নাগাদও মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরবে না। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের অপরিশোধিত তেলবিষয়ক গবেষণা বিভাগের প্রধান জিম বারখার্ডের ভাষ্য, তেলের বাজার আর আগের স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরছে না; বরং অমীমাংসিত সংঘাত ও স্থায়ী নৌপথের ঝুঁকি কেন্দ্র করে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, যুদ্ধের ধাক্কা এখন পর্যন্ত সামলে নিয়েছে তেলের বাজার। তবে এই স্থিতিশীলতার অনেকটাই বিকল্প পথ, মজুত ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, এই তিন ক্ষেত্রে চাপ তত বাড়বে। শেষ পর্যন্ত মজুত ফুরিয়ে গেলে বা হরমুজ ঘিরে নতুন করে বড় হামলা হলে তেলের বাজারে আবার বড় ধাক্কা আসতে পারে।