গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ সংগ্রামে যাঁরা গুম, খুন, নির্যাতন কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তাঁদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি নতুন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে রবিবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তমন্ত্রণালয় সভা।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সভাটি ডাকা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রস্তাবিত এ অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে।
সভায় মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের রাষ্ট্র ইতিমধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাঁদের জন্য ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর’ গঠন করা হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যাঁদের অপরিসীম ত্যাগ রয়েছে, তাঁদেরও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব ব্যক্তি গুম হয়েছেন, নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন অথবা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়ে পরিবারের কাছে আর ফিরে আসেননি—এমনকি যাঁরা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন বা শত শত মিথ্যা মামলায় নিঃস্ব হয়ে বছরের পর বছর কারাবরণ ভোগ করেছেন—তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপ এখন নেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতে কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তি যেন জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করতে না পারে এবং কোনো মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানকে মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার হয়ে স্বজন হারানোর বেদনায় ভুগতে না হয়—সেই লক্ষ্যে স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নতুন অধিদপ্তর গঠনের এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন সভায় বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল মানুষের স্বাধীনভাবে জীবন যাপন, মানবাধিকারের সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের অবসান এবং প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। তাঁর অভিযোগ, ২০০৯ সালের পর থেকে ভোটের অধিকার হরণ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সেই মৌলিক চেতনা পদদলিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় যাঁরা জীবন দিয়েছেন, অত্যাচারিত হয়েছেন, গুম হয়েছেন এবং আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়েছেন—তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের তাগিদ থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আলোচনায় মন্ত্রণালয়ের কার্যপ্রণালি (Rules of Business ১৯৯৬) সংশোধনের মাধ্যমে নতুন এই দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত করার নীতিগত বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি জাতিসংঘের "Basic Principles and Guidelines on the Right to a Remedy and Reparation" নীতিমালা ও বাংলাদেশের সংবিধান অনুসরণ করে ভুক্তভোগী এবং তাঁদের পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করার উপায় নিয়েও মতবিনিময় করা হয়। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে প্রধান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নতুন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের পূর্ণ অধিকার এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করা। তৃতীয়ত, Rules of Business ১৯৯৬ সংশোধন করে মন্ত্রণালয়ের কার্যাবলির মধ্যে এ-সংক্রান্ত দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা।
প্রস্তাবিত এ অধিদপ্তরের মূল দায়িত্ব হবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কল্যাণ, সুচিকিৎসা, আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ। ভুক্তভোগীদের স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার কথা সভায় উঠে আসে।
আন্তমন্ত্রণালয় সভায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ, সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা, যুব ও ক্রীড়া, শ্রম ও কর্মসংস্থান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের পরামর্শ ও মতামত শোনা হয়, যাতে নতুন দায়িত্বটি সুষ্ঠুভাবে মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।



