এক সময় ভারতীয় সিনেমা বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিং মানেই ছিল অভিনয়শিল্পীদের জন্য এক ধরনের মানসিক চাপের বিষয়। দৃশ্যের প্রয়োজন বনাম ব্যক্তিগত সীমারেখা—এই দ্বন্দ্বের স্পষ্ট সমাধান তখন ছিল না। তবে সেই চিত্র বদলেছে। বর্তমানে বলিউড কিংবা ওটিটি শিল্পে আলাদা একটি পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর। এই পরিবর্তনকে অভিনয়শিল্পীদের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন ‘মির্জাপুর’ খ্যাত অভিনেত্রী রসিকা দুগল। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, অন্তরঙ্গ দৃশ্যের সময় এখন একজন প্রশিক্ষিত সমন্বয়কারী উপস্থিত থাকেন, যাতে কোনো শিল্পীই অস্বস্তি বা অসম্মানের শিকার না হন। তাঁর মতে, নাচের দৃশ্যে যেমন কোরিওগ্রাফার থাকেন, অ্যাকশন দৃশ্যে যেমন স্টান্ট ডিরেক্টরের ভূমিকা থাকে, তেমনই ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের জন্যও একজন দক্ষ সমন্বয়কারী প্রয়োজন। এখন আর এসব দৃশ্য শুটিংয়ের সময় হঠাৎ করে তৈরি হয় না। শুরুতেই পরিচালক, সহ-অভিনেতা এবং ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর একত্রে বসে বিস্তারিত পরিকল্পনা করেন। কোথায় স্পর্শ করা হবে, ক্যামেরা কোন কোণ থেকে বসবে, শিল্পীরা কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন—সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়। পরে সেই দৃশ্য বারবার অনুশীলন করা হয়। রসিকার ভাষ্য, কোনো অভিনয়শিল্পী যদি কোনো বিষয়ে আপত্তি জানান, তাহলে দৃশ্যের একই নাটকীয় প্রভাব বজায় রেখে বিকল্প কৌশল খোঁজা হয়। অর্থাৎ দৃশ্যের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি কাউকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয় না। ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো ‘ক্লোজড সেট’ নিশ্চিত করা। অন্তরঙ্গ দৃশ্যের সময় সেটে শুধু প্রয়োজনীয় ব্যক্তিরাই উপস্থিত থাকেন। বাইরের কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারেন না। আগে এই দায়িত্ব কার, তা স্পষ্ট ছিল না; কখনো পরিচালক, কখনো সহকারী পরিচালক বা প্রযোজনা দলের কেউ দেখতেন। এখন নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করেন। ফলে শিল্পীরা জানেন, তাঁদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের দায়িত্বে একজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ রয়েছেন। এতে কাজের পরিবেশ আরও পেশাদার হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন রসিকা। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি স্মরণ করেন, ‘মির্জাপুর’-এর প্রথম মৌসুমের শুটিংয়ের সময় ভারতে ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটরের ধারণা সেভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। পশ্চিমা দেশগুলোতে তখন এ ব্যবস্থা চালু থাকলেও ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রিতে এটি ছিল তুলনামূলক নতুন। তবে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন, কারণ ‘মির্জাপুর’-এর পরিচালক ও পুরো ইউনিট ছিল অত্যন্ত সচেতন। প্রতিটি ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের আগে তাঁর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা হতো—কীভাবে শট নেওয়া হবে, ক্যামেরা কোথায় থাকবে, সবই আগে জানানো হতো। এমনকি কোনো বিষয়ে আপত্তি থাকলে ‘না’ বলার সুযোগও ছিল। আনুষ্ঠানিক ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর না থাকলেও পরিচালকেরা কার্যত সেই দায়িত্বই পালন করতেন। তবে বর্তমান কাঠামোকে তিনি আরও উন্নত ও নিরাপদ মনে করেন। বিশ্বজুড়ে হ্যাশট্যাগ মিটু আন্দোলনের পর ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটরের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। এর উদ্দেশ্য শুধু অভিনয়শিল্পীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা নয়; বরং পরিচালকের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিও যেন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিও দেখা। রসিকার মতে, এতে পরিচালকের কাজও সহজ হয়। কারণ, শুটিং শুরুর আগেই সবাই জানে কী করতে হবে, ফলে বিভ্রান্তি বা অস্বস্তির অবকাশ থাকে না। অন্যদিকে অভিনেতারাও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারেন। ‘মির্জাপুর’ সিরিজে বীণা ত্রিপাঠির চরিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছেন রসিকা। ক্ষমতা, বেঁচে থাকা ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠা এই চরিত্র তাঁকে নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছে। এবার সেই জনপ্রিয় গল্প বড় পর্দায় এসেছে ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’ নামে। এই ছবিতেও তিনি আগের মতোই বীণা ত্রিপাঠির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।
ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিংয়ে এখন আগে থেকেই ঠিক হয় কোথায় স্পর্শ করা হবে: রসিকা দুগল
ভারতীয় চলচ্চিত্র ও ওটিটিতে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিংয়ে এখন ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটরের প্রচলন বাড়ছে। ‘মির্জাপুর’ অভিনেত্রী রসিকা দুগল বলেছেন, এই ব্যবস্থায় আগে থেকেই স্পর্শের সীমানা, ক্যামেরার অবস্থান ও স্বাচ্ছন্দ্য নির্ধারণ করা হয়, ফলে অভিনয়শিল্পীরা নিরাপদ ও সম্মানিত বোধ করেন।




