জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে গবাদি পশুর ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের নজরে রয়েছে। গরু, ছাগল ও ভেড়ার মতো জাবরকাটা প্রাণীর পাকস্থলীর প্রথম অংশ রুমেনে কোটি কোটি অণুজীব বসবাস করে। ঘাস ও খড় ভাঙার সময় এই অণুজীবগুলো হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করে; পরবর্তীতে মিথেনোজেন নামক বিশেষ জীব সেই উপাদানগুলো ব্যবহার করে শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেন উৎপন্ন করে। গরু যখন ঢেঁকুর তোলে, তখন এই গ্যাসের বেশিরভাগ অংশ বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। মিথেন বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় মিথেন বায়ুমণ্ডলে কম সময় টিকে থাকে এবং দ্রুত ভেঙে পড়ে। ফলে গবাদি পশুর মিথেন নিঃসরণ হ্রাস করতে পারলে অল্প সময়ের মধ্যেই জলবায়ুর ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব হতে পারে। এই সম্ভাবনার কারণে বিজ্ঞানীরা রুমেনে মিথেন তৈরির সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বুঝতে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে আসছেন।

সম্প্রতি সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনেছে। গবেষকরা প্রায় ৪৫০টি রুমেন সিলিয়েটের জিনোম বিশ্লেষণ করেন। জিনোম হলো কোনো জীবের জিনের সম্পূর্ণ তথ্য, যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে জীবটির কোষে চলমান প্রক্রিয়া ও সক্ষমতা জানা যায়। এর আগে ২০২১ সালে প্রথম একটি সিলিয়েটের সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে আরও ৫২টি বিশ্লেষিত হয়। কিন্তু রুমেনে সিলিয়েটের বিশাল বৈচিত্র্যের তুলনায় সেই সংখ্যা ছিল নগণ্য। নতুন গবেষণায় একসঙ্গে এতগুলো জিনোমের তথ্য উন্মুক্ত ডেটাবেসে যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে আরও গবেষণার দ্বার খুলে গেছে।

জিনোম বিশ্লেষণের সময় গবেষকরা প্রথমে হাইড্রোজেনেজ নামক একটি এনজাইমের সঙ্গে সম্পর্কিত জিন খুঁজছিলেন। এই এনজাইম হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিছু সিলিয়েটের হাইড্রোজেনেজে অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য দেখা গেলে গবেষকরা আরও অনুসন্ধান চালান। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে কোষ পরীক্ষা করে তাঁরা দেখেন, কোষের বাইরের ঝিল্লির ঠিক ভেতরে এবং সিলিয়ার গোড়ায় ছোট ছোট কাঠামো রয়েছে। প্রতিটি কাঠামো একটি আলাদা ঝিল্লি দিয়ে ঘেরা এবং তার ভেতরেই রয়েছে হাইড্রোজেনেজ এনজাইম। এগুলো সাধারণ কোষীয় কাঠামো নয়; বরং বিশেষ ধরনের অঙ্গাণু। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন হাইড্রোজেনোবডি।

এই অঙ্গাণুটি মূলত হাইড্রোজেন তৈরি করে। আর সেই হাইড্রোজেনকে কাজে লাগিয়েই মিথেনোজেন মিথেন গ্যাস তৈরি করে। পাশাপাশি হাইড্রোজেনোবডি অক্সিজেনও ব্যবহার করতে পারে। মিথেনোজেন অক্সিজেন মোটেও পছন্দ করে না এবং এর উপস্থিতি তাদের কাজকে ব্যাহত করতে পারে। ফলে এই অঙ্গাণুটি একদিকে মিথেন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় হাইড্রোজেন সরবরাহ করছে, অন্যদিকে অক্সিজেন ব্যবহার করে এমন পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে মিথেনোজেন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ইউনিভার্সিটির অণুজীববিজ্ঞানী রড ম্যাকি উল্লেখ করেছেন, রুমেনের পুরো ব্যবস্থাটিই খুব সংগঠিত; বিভিন্ন অণুজীব একে অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করে। একটি অণুজীবের তৈরি করা হাইড্রোজেন যেন নষ্ট না হয়, তার জন্যও নিখুঁত ব্যবস্থা এখানে বিদ্যমান।

সব ধরনের সিলিয়েটের কোষে হাইড্রোজেনোবডির সংখ্যা সমান নয়। আইসোট্রিখ নামক বড় আকারের সিলিয়েটের শরীর প্রায় পুরোপুরি সিলিয়ায় ঢাকা থাকায় চলাফেরার জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। তাই এদের কোষে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হাইড্রোজেনোবডি দেখা যায়। অন্যদিকে এনটডিনোমর্ফ তুলনামূলক ছোট এবং এর সিলিয়াও নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ; ফলে এদের কোষে এই অঙ্গাণুর সংখ্যা কম।

ল্যাবরেটরির গবেষণার পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা বাস্তব প্রমাণের জন্য ১০০টি দুধ দেওয়া গরুর ওপর পরীক্ষা চালান। হেড বক্স নামক বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে গরুর ঢেঁকুর থেকে বের হওয়া গ্যাস সংগ্রহ করে মিথেনের পরিমাণ মাপা হয়। পরবর্তীতে ওই গরুগুলোর রুমেনে থাকা আইসোট্রিখ ও এনটডিনোমর্ফের পরিমাণ বিশ্লেষণ করা হয়। ফলাফলে স্পষ্ট সম্পর্ক দেখা যায়। যেসব গরুর রুমেনে আইসোট্রিখের সংখ্যা বেশি ছিল, তাদের মিথেন নিঃসরণও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ছিল। এর সঙ্গে হাইড্রোজেনোবডির সংখ্যার সরাসরি সম্পর্কও পাওয়া যায়। বিপরীত দিকে, এনটডিনোমর্ফ বেশি থাকা গরুগুলোর মিথেন নিঃসরণ তুলনামূলক কম ছিল। এভাবে প্রথমবারের মতো একটি অণুজীবের কোষের ভেতরের অঙ্গাণুর সঙ্গে গবাদি পশুর মিথেন নিঃসরণের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত হলো।