সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কি সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গাড়ির ড্যাশবোর্ডে ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক হেড ইউনিটগুলোতে ম্যালওয়্যার ছড়ানোর একটি অভিনব কৌশল শনাক্ত করেছে তারা। হ্যাকারদের একটি দল গাড়ির সফটওয়্যার হালনাগাদের জন্য ব্যবহৃত একটি বৈধ অ্যাপ্লিকেশনকে হাতিয়ার করে এই হামলা চালিয়েছে। আক্রান্ত হেড ইউনিটগুলোকে পরে প্রক্সি বটনেটের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সেই সঙ্গে জালিয়াতিমূলক কার্যক্রমেও যুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ম্যালওয়্যার অভিযানের পেছনে রয়েছে 'মোইউ' নামের একটি পরিচিত হ্যাকার গোষ্ঠী। অতীতে 'ব্যাডবক্স' ম্যালওয়্যার বটনেটের সঙ্গে এই গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ছিল। নির্দিষ্ট গাড়ির হেড ইউনিটকে টার্গেট করে ম্যালওয়্যার সংক্রমণের ঘটনা এটি প্রথম নথিভুক্ত উদাহরণ বলেও উল্লেখ করেছে ক্যাসপারস্কি। হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল চীনের প্রযুক্তি কোম্পানি ডুফান, যাদের তৈরি অ্যান্ড্রয়েড হেড ইউনিট মূলত গাড়ির বিনোদন, নেভিগেশন এবং অন্যান্য সেটিংস নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহৃত হয়।
গত জুন মাসে ডুফানের একটি বৈধ সিস্টেম অ্যাপ 'টিডব্লিউকোর' থেকে একটি সন্দেহজনক এপিকে ফাইল ডাউনলোড হতে দেখা যায়। এই অ্যাপটি cardoor[.]cn ঠিকানায় অবস্থিত একটি এমকিউটিটি সার্ভারের মাধ্যমে নির্দেশনা গ্রহণ করছিল। পরবর্তী অনুসন্ধানে গবেষকরা নিশ্চিত হন যে ডাউনলোড হওয়া অ্যাপটির কোনো ব্যবহারকারী ইন্টারফেস নেই। 'জারসার্ভিস' নামের ওই অ্যাপটি আসলে একটি ক্ষতিকর প্রোগ্রাম। এটি চালু হলে একটি এনক্রিপ্ট করা দ্বিতীয় ধাপের কোড ডিক্রিপ্ট করে চালায়, যা হামলাকারীদের নিয়ন্ত্রণাধীন সার্ভারের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। এরপর সেই সার্ভার থেকে আরেকটি এনক্রিপ্ট করা ক্ষতিকর প্রোগ্রাম ডাউনলোড করা হয়। এভাবে বৈধ অ্যাপের আড়ালে হেড ইউনিটে ঢুকে ধাপে ধাপে আরও বিপজ্জনক কোড সক্রিয় করা হয়।
চূড়ান্ত পর্যায়ের এই ম্যালওয়্যার আক্রান্ত হেড ইউনিটের নানাবিধ তথ্য সংগ্রহ করে হামলাকারীদের কাছে পাঠাতে সক্ষম। এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে ডিভাইসের মডেল, স্ক্রিনের রেজোলিউশন, ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের নাম (এসএসআইডি) এবং ম্যাক ঠিকানা। দূর থেকে পাঠানো বিভিন্ন নির্দেশনা কার্যকর করাও সম্ভব ম্যালওয়্যারটির মাধ্যমে। ক্যাসপারস্কির বিশ্লেষণে ম্যালওয়্যারটির ৯ ধরনের নির্দেশনা কার্যকর করার ক্ষমতা পাওয়া গেছে, যার মাধ্যমে অ্যান্ড্রয়েডে সংরক্ষিত তথ্য সংগ্রহ, ক্লিপবোর্ডের তথ্য কপি এবং এইচটিটিপি অনুরোধ পাঠানো যায়। এছাড়াও ওয়েবভিউতে নির্দিষ্ট সাইট খোলা, জাভাস্ক্রিপ্ট চালানো, অতিরিক্ত মডিউল ডাউনলোড এবং ব্রাউজারে নির্দিষ্ট ওয়েব ঠিকানা খোলার মতো কাজও করা সম্ভব। কোনো নির্দিষ্ট সার্ভারে যোগাযোগ হচ্ছে কিনা তা যাচাইও করতে পারে এই ম্যালওয়্যার।
তবে আশার কথা হলো, এই ম্যালওয়্যার গাড়ি চালানো বা গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কোনো হস্তক্ষেপ করে না। গবেষকদের মতে, হামলার মূল উদ্দেশ্য গাড়ির নিয়ন্ত্রণ দখল নয়, বরং আক্রান্ত হেড ইউনিটের ইন্টারনেট সংযোগ কাজে লাগিয়ে আর্থিক লাভ করা। 'ঝিমা' নামের একটি রিভার্স প্রক্সি মডিউলের মাধ্যমে আক্রান্ত ডিভাইসগুলোকে প্রক্সি বটনেটের নোডে পরিণত করা হচ্ছে, ফলে ডিভাইসগুলোর ইন্টারনেট ব্যবহার করে অন্যদের পক্ষে অনলাইন অনুরোধ পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি ক্লিক জালিয়াতির উদ্দেশ্যেও বিভিন্ন ওয়েব অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। ক্যাসপারস্কি এই ম্যালওয়্যার সম্পর্কে ডুফানকে জানালে তারা সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়েছে। তবে কীভাবে বৈধ অ্যাপের মাধ্যমে ম্যালওয়্যারটি হেড ইউনিটে প্রবেশের সুযোগ পেল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।




