কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ ও তার প্রভাব নিয়ে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যানফোর্ড এইচএআই ২০২৬ এআই ইনডেক্স রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ৪২৩ পৃষ্ঠার এই গবেষণাপত্রে এআইয়ের বৈশ্বিক অগ্রগতি ও তার বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি মাত্র তিন বছরের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৫৩ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে, যা ব্যক্তিগত কম্পিউটার বা ইন্টারনেটের প্রচারের চেয়েও অনেক দ্রুত। প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বাধুনিক এআই মডেলের ব্যবহার ৮৮ শতাংশে পৌঁছেছে, কারণ এগুলো এখন জটিল কাজগুলোতে মানুষের দক্ষতার সমকক্ষ হয়ে উঠছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, নথিভুক্ত এআই নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুর্ঘটনার সংখ্যা ৩৬২টিতে পৌঁছেছে, যা প্রমাণ করে এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির তুলনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো এআই মডেলগুলোর সীমাবদ্ধতা। গুগলের জেমিনাই ডিপ থিংক মডেল আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন সমাধান করে স্বর্ণপদক পেলেও, একটি সহজ এনালগ ঘড়ির সময় সঠিকভাবে বলতে পারে মাত্র ৫০.১ শতাংশ ক্ষেত্রে। একইভাবে, সফটওয়্যারনির্ভর সিমুলেশনে এআইচালিত রোবটের সফলতার হার ৮৯.৪ শতাংশ হলেও, বাস্তব গৃহস্থালি কাজে সেই সফলতার হার নেমে আসে মাত্র ১২ শতাংশে। অর্থাৎ গবেষণাগারে সফল হলেও বাস্তব জীবনে এআইচালিত রোবট এখনো ব্যর্থ।

স্ট্যানফোর্ড এইচএআইয়ের কো-চেয়ার ইয়োলান্ডা গিল এবং রেমন্ড পেরোল্ট মন্তব্য করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন একটি প্রযুক্তি যা অতীতের যেকোনো প্রযুক্তির চেয়ে দ্রুত সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালে তৈরি হওয়া ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি বাণিজ্যিক খাত থেকে এসেছে এবং এগুলো পিএইচডি পর্যায়ের বিজ্ঞান প্রশ্ন, মাল্টিমোডাল রিজনিং ও গণিত প্রতিযোগিতায় মানুষের সমান দক্ষতা দেখাচ্ছে। গত এক বছরে কোডিং বেঞ্চমার্কে এআইয়ের দক্ষতা ৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পড়াশোনায় এআই ব্যবহার করছে।

বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ব্যবধান প্রায় শূন্য। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীনের ডিপসিক-আর১ মডেল মার্কিন শীর্ষ মডেলের সমকক্ষ হয়েছিল এবং ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানথ্রোপিক মডেল মাত্র ২.৭ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে। গুণমানের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ এআই মডেল তৈরি করলেও, গবেষণাপত্র, সাইটেশন এবং শিল্প রোবটের ব্যবহারে চীন এগিয়ে আছে। অন্যদিকে মাথাপিছু এআই পেটেন্টে বিশ্বের শীর্ষস্থান দখল করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। যুক্তরাষ্ট্রে ৫ হাজার ৪২৭টি এআই ডেটা সেন্টার রয়েছে, যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। তবে শীর্ষ এআই চিপগুলোর প্রায় সবগুলোই তাইওয়ানের একক প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি তৈরি করছে, ফলে বৈশ্বিক এআই যন্ত্রাংশ সরবরাহ একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

এআই প্রযুক্তির এই বিস্তার পরিবেশের উপরও চাপ ফেলছে। গ্রোক ৪ মডেলের প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে আনুমানিক ৭২ হাজার ৮১৬ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়েছে। এআই ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ সক্ষমতা বেড়ে ২৯.৬ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের পিক বিদ্যুৎ চাহিদার সমান। জিপিটি-৪-এর বার্ষিক পানি খরচ দিয়ে ১২ লাখ মানুষের খাওয়ার পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিবাচক দিক হিসেবে, চিকিৎসকদের রিপোর্ট লেখার সময় এআই প্রায় ৮৩ শতাংশ সময় বাঁচিয়ে দিচ্ছে। তবে ৫০০টির বেশি ক্লিনিক্যাল এআই গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ৫ শতাংশ গবেষণায় প্রকৃত রোগীর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।