দুই দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক এলাকার পরিচিত ‘অন্ধের টেক’-এ বিদ্যুৎ সংযোগের সূচনা হয়েছে। সম্প্রতি একটি বসতবাড়িতে মিটার লাগানোর মাধ্যমে এলাকাটি প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। যদিও বাকি ৪৪টি পরিবারের ঘর এখনো অন্ধকারে; পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তাঁদেরও মিটার সংযোগ সম্পন্ন হবে।

২০০১ সাল থেকে এই এলাকায় ৪৫টি পরিবার বসবাস করে আসছে। এদের মধ্যে ২৭টি ঘরে বসবাস করেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি; অবশিষ্ট ঘরগুলো তাঁদের সন্তান ও অন্যান্য স্বজনের। বসতির শুরু থেকেই তাঁরা বিদ্যুৎ সংযোগের দাবি জানিয়ে আসছিলেন, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তা পূরণ হয়নি। সন্ধ্যা নামলেই পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যেত এবং প্রতিটি ঘরেই আলোর অভাবে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ত। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার যোগাযোগের পর এক সময় সেখানে বিদ্যুতের খুঁটি ও ট্রান্সফরমার বসানো হলেও পরবর্তীতে কিছু অজানা বাধার মুখে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। ফলে বছরের পর বছর বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে হয়েছে বাসিন্দাদের।

এই অন্ধকারের চিত্র ২০২২ সালের ১৬ জুলাই প্রথম আলোতে ‘আঁধারে অন্ধের টেক’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে নজরে আসে। তিন দিন পর, ১৯ জুলাই, ‘অন্ধপাড়ায় কেন অন্ধকার, অবিলম্বে বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া হোক’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয়ও প্রকাশিত হয়। এরপর সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর চাপের মুখে তা থেমে যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। রাজনৈতিক পরিবেশ বদলের পর বাসিন্দারা গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান, জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূইয়া এবং মৌচাক ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলামের কাছে আবেদন জানান। তাঁদের সক্রিয় হস্তক্ষেপে মিটার সংযোগের কাজ পুনরায় শুরু হয় এবং একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়ার অগ্রগতির কথা জানিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম বলেছেন, সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় মিটার সংযোগের কাজ এগিয়ে চলছে এবং সেখানে একটি সাবমার্সিবল পাম্পও বসানো হয়েছে।

২০ আগস্ট বাংলাদেশ অন্ধ কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি সাহাজ উদ্দিনের পুত্র ফারুক হোসেনের ঘরে প্রথম মিটার সংযোগ দেওয়া হয়। এতে একটি ঘর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হলেও বাকি ৪৪টি পরিবার এখনো সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির দ্রুত পূরণ হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মৌচাক জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক রফিকুল আজাদ। পাশাপাশি প্রতিটি ঘরে মিটার লাগানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই উদ্যোগে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, এতদিন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অন্ধকারে জীবন কাটাচ্ছিলেন; এখন বিদ্যুতের আলোয় তাঁদের জীবনযাপন সম্ভব হবে। বাংলাদেশ অন্ধ কল্যাণ সমিতির সভাপতি কোরবান আলীও এই পদক্ষেপে খুশি প্রকাশ করে দ্রুত অন্য পরিবারগুলোর সংযোগ সম্পন্নের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, যে জমিতে এই পরিবারগুলো বসবাস করছেন, সেটি লিজ নেওয়ার জন্য একটি পক্ষ আবেদন করেছিল। তবে জেলা প্রশাসন কাউকেই জমিটি লিজ দেয়নি। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের কথা বিবেচনা করে এখন তাঁদের নামে জমিটি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া। এই সিদ্ধান্তের ফলে বসতির স্থায়িত্বও নিশ্চিত হওয়ার পথ প্রশস্ত হলো বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।