প্রখ্যাত ভাষাসংগ্রামী ও লেখক আহমদ রফিকের স্মৃতিবিজড়িত নানা সামগ্রী সংরক্ষণের জন্য একটি পরিপূর্ণ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে ‘ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ফাউন্ডেশন’। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল সাদী সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেন, রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠানের আনুকূল্য ছাড়া এই মূল্যবান সংগ্রহগুলো দীর্ঘদিন আগলে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

গত বছর আহমদ রফিকের জন্মদিনে তিনি ছিলেন সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে। সেই সময় থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। অবশেষে গত ৯৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই ভাষাসংগ্রামী। জীবনের শেষ প্রান্তে তাঁর রক্তসম্পর্কীয় কেউ ছিলেন না বললেই চলে। তবে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত কয়েকজন ছিলেন পরমাত্মীয়ের মতো। ইসমাইল সাদী লেখায় উল্লেখ করেন, আহমদ রফিককে ‘পরিবারহীন, স্বজনহীন, সংজ্ঞাহীন’ বলা হতো।

আহমদ রফিক ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। এই আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে তাঁর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নকালে দুই বছর ঝরে পড়ার পর ফিরে এলেও প্রশাসন তাঁকে ইন্টার্ন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। ফলে চিকিৎসক হিসেবে পেশা শুরু করতে পারেননি তিনি। এরপর রাজনীতি ও লেখালেখি—এই দুটি পথের মধ্যে বেছে নেন সাহিত্যকেই। চাকরি বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত লেখালেখিকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন।

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বাইরে থেকেই ৯৬ বছরের জীবন কাটিয়েছেন আহমদ রফিক। তিনি ‘ভাষাসৈনিক’ নয়, নিজের উদ্ভাবিত ‘ভাষাসংগ্রামী’ শব্দটি ব্যবহার করতেন। বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে আমৃত্যু লিখে গেছেন। জীবদ্দশায় অর্থনৈতিক সচ্ছলতার সময় রবীন্দ্রসাহিত্যের দর্শন প্রসারে কাজ করেছেন। তিনি সম্পদের ব্যক্তিমালিকানায় বিশ্বাস করতেন না, তাই সঞ্চয় করেননি। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রবীন্দ্র চর্চকেন্দ্র ট্রাস্ট এবং দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য তহবিল গঠন করে গেছেন। এমনকি নিজের দেহও চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির জন্য দান করে গেছেন।

ইসমাইল সাদী বলেন, এক যুগের বেশি সময় আহমদ রফিকের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকার কারণে তিনি ভালোভাবে জানতেন—শেষ জীবনে তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল আপনজনের যত্ন। কিন্তু তা পাননি। তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল এমন গুণী মানুষের প্রতি। দুঃখজনকভাবে রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করেনি। তাঁর চিকিৎসার জন্য কিছুটা সহায়তা এসেছিল যখন তিনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে নিয়ে ‘জীবন চলে অন্যের সহায়তায়’, ‘প্রয়োজন তাঁকে আগলে রাখা’, ‘উপার্জনহীন জীবনে দরকার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা’—এমন শিরোনামে লেখা হলেও রাষ্ট্রের তেমন সাড়া মেলেনি।

আহমদ রফিকের অনুমতি নিয়ে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ফাউন্ডেশন’। তাঁর অনুপস্থিতিতে বইপত্রসহ সব কিছু দেখভালের দায়িত্ব পান তারা। ফাউন্ডেশন এখন প্রায় শূন্যহাতে কাজ চালাচ্ছে। তাঁর সংগৃহীত বইয়ের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হতে পারে। এছাড়াও রয়েছে বেশ কিছু ডায়েরি, চিঠিপত্র, ব্যবহার্য জিনিসপত্র, স্মারক ইত্যাদি। এসব প্রতিটি সামগ্রীই ভাষাসংগ্রামীর নামাঙ্কিত হওয়ায় অমূল্য।

তাঁর মৃত্যুর পর ফাউন্ডেশন আশ্রয় পেয়েছে একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কার্যালয়ের ছোট একটি ঘরে। প্রায় বিনা খরচে ওই জায়গা দিয়েছে সংস্থাটি। কিন্তু এতে সামগ্রীগুলো প্রদর্শনের কোনো সুযোগ নেই। ফাউন্ডেশন চায় আহমদ রফিকের সব সংগ্রহ নিয়ে একটি পরিপূর্ণ স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করতে। সেখানে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে একজন ভাষাসংগ্রামীর আত্মত্যাগ এবং পূর্ণকালীন লেখকের জীবনসংগ্রামের কথা। গবেষকরাও পাবেন তাঁর রচনা নিয়ে কাজ করার সুযোগ।

ইসমাইল সাদী বলেন, বর্তমান জায়গাটি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই! ছোট সে তরী’—এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছেন তারা। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে, রাষ্ট্র তাঁর জীবদ্দশায় সুবিচার না করলেও অন্তত রেখে যাওয়া মূল্যবান জিনিসপত্রের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিক এবং ফাউন্ডেশনের পাশে দাঁড়াক। স্মৃতির প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানিয়ে তিনি এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।