ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা তিনতলা ভবনটি বাইরে থেকে দেখে যেকোনো মানুষকে সচল হাসপাতাল মনে হলেও ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই ট্রমা সেন্টারে রোগী ভর্তি বা নিয়মিত চিকিৎসার কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। বেশিরভাগ কক্ষ খালি পড়ে আছে, কোনো কক্ষে পুরোনো যন্ত্রপাতির স্তূপ, আর নিচতলার একটি অংশে চলছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি পরীক্ষার কাজ। সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত জরুরি সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে তৈরি এই কেন্দ্রটি অকার্যকর থাকায় গুরুতর আহত রোগীদের এখনো হবিগঞ্জ, সিলেট বা ঢাকার দূরবর্তী হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে।
গণপূর্ত প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে ফিজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় বাহুবলে ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনতলা ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৩ সালে, যাতে মোট খরচ হয় প্রায় ৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ফ্যাসিলিটি রেজিস্ট্রিতে এটি 'বাহুবল ২০ শয্যাবিশিষ্ট ট্রমা সেন্টার' নামে তালিকাভুক্ত হলেও কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। নির্মাণ শেষে ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গণপূর্ত বিভাগ ভবনটি স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা করলে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস-সংযোগসহ নানা অসম্পূর্ণতার কারণে সেটি গ্রহণ করেনি স্বাস্থ্য বিভাগ। দুই বিভাগের মধ্যে চিঠি চালাচালির পর শেষ পর্যন্ত প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ করে কিছু অবকাঠামোগত কাজ সেরে ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। ওই বছরের জুনে উদ্বোধন হলেও চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় কার্যক্রম এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০২৬ সালের জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে দেশের ২৪টি ট্রমা সেন্টারের তালিকায় বাহুবলের এই কেন্দ্রটিকেও পূর্ণাঙ্গভাবে অচল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানে জনবল ও সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এদিকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ট্রমা সেন্টার ভবনে চুরির ঘটনা ঘটেছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে অন্য বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি কিছু মালামাল ও যন্ত্রপাতি চুরির অভিযোগ উঠেছে।
বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টা 'গোল্ডেন আওয়ার' হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে দ্রুত জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা শুরু করতে পারলে গুরুতর আহত রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু কেন্দ্রটি চালু না থাকায় সেই সুবিধা রোগীরা পাচ্ছেন না। স্থানীয় লামাতাসি গ্রামের আজমান আহমেদ বলেন, বাহুবল ও আশপাশের এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে গুরুতর আহতদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য বাইরে পাঠাতে হয়। ট্রমা সেন্টারটি চালু থাকলে মানুষের অনেক উপকার হতো।
বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এম সোলায়মান খান জানান, ট্রমা সেন্টার চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, 'জনবল ও সরঞ্জামের অনুমোদন পেলে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন হলে কেন্দ্রটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে।' তবে এতদিন ধরে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান অকার্যকর থাকায় সরকারি বিনিয়োগের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা বলে অভিযোগ উঠেছে।



