দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগারটি ১৯৬৮ সালে চালু হয়েছিল। সেই পুরনো স্থাপনার পাশেই এবার গড়ে উঠতে যাচ্ছে দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার। ৩০ লাখ টন শোধন ক্ষমতাসম্পন্ন এই নতুন শোধনাগার চালু হলে দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। ফলে ডিজেল, অকটেনসহ পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও সহায়ক হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অর্থায়নই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টেম্বর) ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে সরকার। চুক্তি অনুযায়ী ১০০ কোটি ডলার বা প্রায় ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে) অর্থায়ন করবে সংস্থাটি। বাংলাদেশ সচিবালয়ে আয়োজিত স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সরকারের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান এবং আইডিবির পক্ষে সংস্থাটির ডিরেক্টর জেনারেল (কান্ট্রি প্রোগ্রামস) আনাসি আইসামি চুক্তিতে সই করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও আইডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আল জাসের উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় বলেন, বাংলাদেশে নতুন সরকার এসেছে এবং দেশের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা রয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলাই লক্ষ্য। এটি কোনো স্লোগান নয়, একটি পরিকল্পনা। রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে এ দশকে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করতে চায় সরকার।

বর্তমানে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ১৫ লাখ টন সক্ষমতার একমাত্র সরকারি শোধনাগারটি পরিচালনা করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। একই এলাকায় দ্বিগুণ সক্ষমতার নতুন শোধনাগারটি নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইআরএল’। এর আগে ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল-২’ নামে ২০১২ সালে প্রথম প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। পরে অন্তত ১১ বার ডিপিপি সংশোধন হলেও তা আর বাস্তবায়নে যেতে পারেনি। ২০২৪ সালে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার এসে সেই প্রকল্প বাতিল করে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি একনেক থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রকল্পের নতুন নামকরণ করা হয়। তখন খরচ ধরা হয়েছিল ৩১ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকারি কোষাগার থেকে ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা ও বিপিসির মাধ্যমে ১২ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা অর্থায়নের পরিকল্পনা ছিল। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার এসে অর্থায়নের ধরন বদলে বিদেশি ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগামী ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারিত আছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি করতে গেলে বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ পড়ত। তাই বিদেশি ঋণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, জ্বালানি তেল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার আলোচনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। শোধনাগার নির্মাণে বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ায় এ খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এটি স্বস্তির খবর এবং ভোক্তারা এর সুফল পাবেন। তবে প্রকল্পের কাজ যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয় এবং নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।