রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার খিয়ারজুম্মা এলাকায় রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শফিকুল ইসলাম, যিনি স্থানীয়দের কাছে 'ট্রাফিক শফি' নামে পরিচিত। সরকারি কোনো পদবি বা মাসিক বেতনের নিশ্চয়তা না থাকা সত্ত্বেও প্রায় এক বছর ধরে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং পথচারীদের নিরাপদ পারাপারে সহায়তা করছেন তিনি। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে শুরু করে কখনো কখনো রাত ১০টা পর্যন্ত তাঁকে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে ছোট শিক্ষার্থীদের হাত ধরে রাস্তা পার করে দেওয়া এবং বয়স্কদের সহায়তা করা তাঁর নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

এই নিঃস্বার্থ কাজের পেছনে রয়েছে একটি বেদনাদায়ক স্মৃতি। ২০২৫ সালের ৯ জুলাই শফিকুলের চোখের সামনেই ট্রাকের ধাক্কায় এক মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়। সেই মর্মান্তিক দৃশ্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি নিজেই সড়কে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজ করবেন। খিয়ারজুম্মা বাসস্ট্যান্ডটি একটি চারমুখী মোড় এবং এখানে আঞ্চলিক সড়কের সংযোগ থাকায় এলাকাটি অত্যন্ত ব্যস্ত থাকে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট স্থানে সাতটি আলাদা দুর্ঘটনায় সাতজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং চারজন আহত হয়েছেন। শফিকুলের বাড়ি এই বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে।

পারিবারিক ও অর্থনৈতিকভাবে শফিকুল বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ছয় সন্তানের বাবা এই ব্যক্তির সংসারে অভাব থাকলেও অন্যের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি নিজের সময়ের বড় অংশ ব্যয় করেন। দিনে কেবল দুপুরে সামান্য সময়ের জন্য বাড়ি ফিরে খাবার খেয়েই তিনি পুনরায় মহাসড়কে ফিরে আসেন। তাঁর মনে সবসময় এই ভয় থাকে যে, তিনি উপস্থিত না থাকলে হয়তো আবারও কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শুরুর দিকে পোশাক ও জুতা পর্যন্ত ধার করে এই কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তাঁর এই প্রচেষ্টায় অনুপ্রাণিত হয়ে তারাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজার রহমান তাঁকে কমিউনিটি পুলিশের একটি ভেস্ট ও জ্যাকেট প্রদান করেন।

স্থানীয় শিক্ষার্থী নাজমুল হক ও কাইয়ুম ইসলাম জানান, শফি দাদার কারণে এখন আর রাস্তা পার হতে ভয় পান না তারা। স্থানীয় আলমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম এবং মানবকল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্য চন্দন রায় শফিকুলের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ওসি মোস্তাফিজার রহমান জানান, খিয়ারজুম্মা অত্যন্ত যানজটপূর্ণ এলাকা হওয়ায় সেখানে শফিকুলের স্বেচ্ছাসেবী ভূমিকা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ সহায়ক হচ্ছে। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই তাঁর এই কাজের ফলে ওই এলাকায় দুর্ঘটনার হার কমেছে এবং সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেয়েছে বলে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কোনো আইনি ক্ষমতা বা পদবি ছাড়াই কেবল মানুষের প্রতি দায়বোধ থেকে শফিকুল ইসলাম প্রতিদিন শত শত মানুষের জীবন নিরাপদ করছেন।