কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। এআই খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে দুটি স্পষ্ট বিপরীত মেরু তৈরি হয়েছে।
একপক্ষে রয়েছেন ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যান এবং অ্যানথ্রোপিক-এর দারিও আমোদেয়। তাঁদের মতে, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এআই কোম্পানিগুলোর উচিত প্রয়োজনে উন্নয়নের গতি কমিয়ে আনা এবং সাধারণ নিরাপত্তা মানদণ্ড বজায় রাখতে স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের সহায়তা নেওয়া। আমোদেয় বিশেষ করে এমন এক ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছেন যেখানে বাইরের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা সিস্টেমগুলো পরীক্ষা করতে পারবেন, আর অল্টম্যানও এই প্রস্তাবের সাথে একমত হয়ে ওপেনএআই-এর ভেতরে স্বাধীন মূল্যায়নকারী রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, মেটা-র মার্ক জাকারবার্গ এবং এনভিডিয়া-র জেনসেন হুয়াং এই ধরণের নতুন আইনি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। হুয়াং-এর দাবি, এআই-এর উন্নয়ন গতি এবং নিরাপত্তা একে অপরের পরিপন্থী নয়, তাই নতুন কোনো আইনের প্রয়োজন নেই। জাকারবার্গের মতে, বাজার নিজেই কোম্পানিগুলোকে নিয়মের আওতায় আনবে। কারণ ব্যবহারকারীরা এমন কোনো এআই এজেন্ট ব্যবহার করবেন না যা অনিয়ন্ত্রিত আচরণ করে। ফলে বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সঠিক সমন্বয়ই হবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বড় অস্ত্র। তিনি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন যে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মেটা তাদের 'মিউজ' (Muse) এজেন্টটি বাজারে আনতে কয়েক মাস দেরি করেছে।
এই দ্বন্দ কেবল বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কানাডীয় এআই ল্যাব 'কোহিয়ার' (Cohere) সতর্ক করেছে যে, সিলিকন ভ্যালির অল্প কিছু প্রভাবশালী কোম্পানির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত একটি 'কার্টেল'-এ পরিণত হতে পারে। কোহিয়ারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এইডান গোমেজ একটি প্রমাণ-ভিত্তিক ঝুঁকি কাঠামো এবং বাধ্যতামূলক স্বচ্ছতার দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রধান এআই অফিসার জোয়েল পিনো মনে করেন, নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থাকলেও তা যেন কেবল মুষ্টিমেয় কয়েকটি ল্যাব দ্বারা নির্ধারিত না হয়, কারণ এতে সাধারণ নাগরিকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
এই লড়াই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনেও পৌঁছেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, জাকারবার্গ, হুয়াং এবং ইলন মাস্ক আলাদাভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে যোগাযোগ করেছেন। গুগল ডিপমাইন্ড-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডিমিস হাসাবিস প্রস্তাব করেছিলেন শিল্প-অর্থায়িত একটি তদারকি সংস্থা গঠন করার, যা ট্রাম্প গ্রহণ করেননি। ট্রাম্পের মতে, এআই নিয়ন্ত্রণ চীনের সাথে আমেরিকার প্রতিযোগিতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সুরক্ষাকবচ হলো একজন 'উচ্চ আইকিউ' সম্পন্ন প্রেসিডেন্ট।
সবশেষে, এই বিতর্কটি 'ইফেক্টিভ অলট্রুয়িজম' (EA) নামক একটি দার্শনিক আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে যাওয়ায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আমোদেয়-এর প্রস্তাবিত নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনাকে কিছু রক্ষণশীল গোষ্ঠী 'সুপার-ওক গ্লোবালিজম' হিসেবে আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করছে। এমনকি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটি অফিস থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, 'ইফেক্টিভ অলট্রুয়িজম' নয়, বরং 'আমেরিকানিজম'-ই হবে এআই-এর আধিপত্য বজায় রাখার মূলমন্ত্র। এই চরম মেরুকরণ আগামীতে এআই-এর জন্য কোনো বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক নিয়ম তৈরি করাকে আরও কঠিন করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।




