একসময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখলেও, এখন অনেক প্রযুক্তি নেতা এই বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলেন শপিফাই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও টোবিয়াস লুৎকে। গত বছর তিনি কর্মীদের বলেছিলেন যে, এআই ব্যবহার করাটা এখন একটি প্রাথমিক প্রত্যাশা এবং অতিরিক্ত সম্পদ চাওয়ার আগে কর্মীদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা এআই ব্যবহার করেও কাজ শেষ করতে পারেননি। তবে বর্তমানে তিনি লক্ষ্য করেছেন, অনেক কর্মী এআই ব্যবহার করে যাচাই-বাছাইহীন ইমেল ও কোড তৈরি করছেন এবং তার দায়ভার নিচ্ছেন না। মঙ্গলবার 'দ্য নলেজ প্রজেক্ট' পডকাস্টে কথা বলার সময় তিনি এই ধরনের নিম্নমানের আউটপুটকে 'স্লপ গ্রেনেড' (slop grenades) বলে অভিহিত করেছেন, যা একে অপরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। লুৎকের মতে, এআই-কে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছেড়ে দেওয়া সহজ, তবে এর অপব্যবহার শেষ পর্যন্ত যারা কাজগুলো পর্যালোচনা করেন তাদের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, এআই-এর কাজ হওয়া উচিত ইমেলের মূল বিষয়বস্তু সংক্ষেপ করা, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘ ও অপ্রয়োজনীয় বার্তায় পরিণত হয়, যা পড়ার সময় নষ্ট করে এবং সহকর্মীদের কাছে ভুল প্রমাণিত হয়।

অনুরূপভাবে ডুয়োলিঙ্গোর সিইও লুইস ভন আন-ও তার আগের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। গত বছর তিনি কোম্পানিটিকে 'এআই-ফার্স্ট' করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, যার অধীনে কর্মীদের এআই ব্যবহারের দক্ষতা মূল্যায়ন এবং মানুষের পরিবর্তে এআই কন্ট্রাক্টরের নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল। তবে মে মাসে তিনি স্বীকার করেন যে, এআই-এর প্রাথমিক উপস্থাপনা দেখে তিনি কিছুটা প্রভাবিত হয়েছিলেন, কিন্তু সৃজনশীলতার দিক থেকে এটি মানুষের সমান নয়। বিশেষ করে যখন বড় পরিসরে কাজ করা হয়, তখন অনেক আউটপুট সম্পূর্ণ অর্থহীন বা 'স্লপ' হয়ে যায়, যা রোধ করতে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়।

গবেষকরা এই পরিস্থিতিকে 'ওয়ার্কস্লপ' (workslop) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এটি এমন এক ধরণের এআই আউটপুট যা দেখতে নিখুঁত মনে হলেও আসলে ত্রুটিপূর্ণ, ফলে তা সংশোধন করতে গিয়ে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। বেটারআপ ল্যাবস এবং স্ট্যানফোর্ড সোশ্যাল মিডিয়া ল্যাবের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৯৬২ জন পূর্ণকালীন ডেস্ক কর্মীদের মধ্যে ৫২.৭ শতাংশই স্বীকার করেছেন যে তারা সহকর্মীদের কাছে এআই-তৈরি নিম্নমানের কাজ পাঠিয়েছেন। যেসব প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের উৎসাহ দেওয়া হয়, সেখানে এই প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে, প্রায় ৩৮ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন যে তারা এআই-তৈরি ত্রুটিপূর্ণ কাজ গ্রহণ করেন এবং তা সংশোধন করতে প্রতি মাসে গড়ে ৩.৪ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন।

মানুষের করা নিম্নমানের কাজের সাথে 'ওয়ার্কস্লপ'-এর পার্থক্য হলো, এটি বাইরে থেকে বৈধ মনে হলেও কার্যকর তথ্যের অভাব থাকে। যেমন—সুন্দরভাবে সাজানো ইমেলে ভুল লিংক থাকা বা অপ্রয়োজনীয় জটিল কোড তৈরি করা। এছাড়া এই প্রবণতা সহকর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা এআই-নির্ভর নিম্নমানের কাজ পাঠান, তাদের সহকর্মীরা কম দক্ষ এবং কম বন্ধুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। এমনকি ৩৬ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, তারা ভবিষ্যতে এই ধরণের সহকর্মীদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী নন। গত বছরের তুলনায় এই সমস্যা বেড়েছে; আগে যেখানে গড়ে ২ ঘণ্টা সময় ব্যয় হতো, এখন তা ৩.৪ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। আর্থিক হিসেবে, ২০২৫ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, একজন কর্মীর জন্য মাসে ১৮৬ ডলার এবং ১০ হাজার কর্মীর একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বছরে প্রায় ৯ মিলিয়ন ডলারের উৎপাদনশীলতা নষ্ট হচ্ছে।