শিক্ষাব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন সমীক্ষা ও গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখন পড়াশোনা, গবেষণা এবং প্রবন্ধ রচনার কাজে চ্যাটবটের সাহায্য নিচ্ছেন। এর ফলে তাদের নিজস্ব বুদ্ধি ও সৃজনশীলতা ব্যবহার করে বাক্য গঠন, সঠিক ব্যাকরণ শেখা এবং বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করার সক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষকেরা।

মনোবিজ্ঞানী রোনাল্ড টি. কেলগ বহু বছর ধরে মানুষের লেখার প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন। তাঁর মতে, একটি যুক্তিনির্ভর ও গুছিয়ে লেখা তৈরি করা মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন ও পরিশ্রমসাপেক্ষ—যেন কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে গর্ত করার মতো কষ্টকর কাজ। ভালো মানের লেখার জন্য শব্দভাণ্ডার, বানান ও ব্যাকরণের ওপর দৃঢ় দখল থাকা আবশ্যক। এই প্রক্রিয়ায় লেখককে একটি বিষয় গভীরভাবে অনুধাবন করতে হয়, নিজের স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তথ্য বের করতে হয় এবং সেগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সাজাতে হয়। এমন গভীর মনোযোগের প্রয়োজন হয় যে সময়ে অন্য কোনো কাজে মন দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেলগের ভাষায় বলা যায়, “লেখা হলো মূলত চিন্তা করার একটি আধুনিক মাধ্যম।” তাঁর গবেষণা আরও ইঙ্গিত করে যে, শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত এই দক্ষতা অর্জনে দীর্ঘ বছর সময় লাগে; তাই এটি সহজে অর্জিত কোনো ক্ষমতা নয়।

ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, ১৮৭০ সালের আগে মার্কিন শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হতো মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু পরবর্তীতে অফিস-আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং টাইপরাইটারের আবিষ্কারের ফলে গুছিয়ে ও সুসংগঠিত লেখার চাহিদা তৈরি হয়। তখন থেকেই বিদ্যালয়ে সবার জন্য লেখালেখি শেখানোর প্রথা চালু হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোনো বিষয় গভীরভাবে বুঝতে ও দীর্ঘদিন মনে রাখতে সেটি লিখে ফেলা সবচেয়ে কার্যকর ও প্রমাণিত পদ্ধতি। নিজে থেকে লিখতে গেলে চিন্তাশক্তি ও মেধা উভয়ই বৃদ্ধি পায়। তবে বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরা কষ্ট কমানোর উপায় হিসেবে এআইয়ের দিকে ঝুঁকছে। পছন্দ হোক বা না হোক, তারা এখন প্রবন্ধ ও গবেষণাপত্র রচনার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিচ্ছেন।

এই প্রবণতা দেখে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করে লেখা উচিত, যাতে তাদের চিন্তার বিকাশ ঘটে। তাই বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাচ্ছে—ক্লাসরুমে বসে কাগজ-কলমে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করতে না পারে। নিউইয়র্কের জন জে হাই স্কুলের শিক্ষিকা জেসিকা বিনি অবশ্য এআইকে শিক্ষার কাজে প্রয়োগের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। তিনি ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রথমে এআইয়ের সাহায্যে কবিতা রচনা করান, পরে সেই কবিতার গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে এআইয়ের মাধ্যমেই সংশোধন করান। তবে বাড়ির কাজে এআইয়ের অপব্যবহার রোধ করতে তিনি এখন ক্লাসরুমেই শিক্ষার্থীদের হাতে লিখতে বাধ্য করছেন।

অন্যদিকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্তারা বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। তাঁদের যুক্তি, কর্মক্ষেত্রে লেখার বড় একটি অংশ এখন এআইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। তাই আগের মতো একা পরিশ্রম করে লেখার প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমে এসেছে। তাছাড়া গুছিয়ে ও সুসংগঠিত লেখার ক্ষেত্রে চ্যাটবট এখন অনেক মানুষের চেয়েই এগিয়ে রয়েছে। ফলে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—লেখালেখির জন্য এত পরিশ্রম করা কেন আজও জরুরি? এবং নিজের চিন্তা থেকে লেখা বন্ধ করে দিলে শিক্ষার্থীরা আসলে কী হারাচ্ছেন?

মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষাবিষয়ক গবেষকরা অবশ্য ঢালাওভাবে এআইয়ের বিরোধিতা করছেন না। প্রযুক্তির এই বিশাল অগ্রগতি দেখে তাঁরা নতুন সম্ভাবনার কথা ভাবছেন। তবে তাঁদের গবেষণা একটি বিষয়ে স্পষ্ট সতর্কতা জারি করেছে—চিন্তা করা, খসড়া তৈরি করা এবং লেখা সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়ায় এআইকে অন্তর্ভুক্ত করা ঠিক নয়। কারণ, যদিও নিজে লেখার কাজটি কঠিন ও সময়সাপেক্ষ, তবু এই কঠিন কাজটিই মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক। লেখার মাধ্যমে আমাদের স্মৃতিশক্তি, পরিকল্পনা করার ক্ষমতা এবং নিজের ভাবনা নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। শৈশব থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত এই দক্ষতা অর্জনে বহু বছর সময় লাগে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।

বর্তমানে গুগল ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠান এমন এআই তৈরি করছে, যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা সরাসরি লিখে দেবে না; বরং তাদের চিন্তা করতে সাহায্য করবে। পরীক্ষামূলকভাবে গুগলের ‘জেমিনি গাইডেড লার্নিং’ এবং ওপেনএআইয়ের ‘চ্যাটজিপিটি স্টাডি মোড’ শিক্ষার্থীদের শিক্ষকের মতো বিভিন্ন প্রশ্ন করে চিন্তার প্রক্রিয়াকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। তবু বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, নিজের বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতা অক্ষুণ্ণ রাখতে হাতে লেখার চর্চার কোনো বিকল্প নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই দিয়ে লিখলে মস্তিষ্কের কার্যক্রম কমে যায়; এমনকি নিজের লেখা কী ছিল, তাও পরবর্তীতে মনে থাকে না। ফলে অতিরিক্ত এআই ব্যবহারে মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তি হ্রাস পেতে পারে। এছাড়া এআই ইন্টারনেটের পুরোনো তথ্যই পুনর্বিন্যাস করে লেখে, তাই এতে মৌলিক ভাবনার অভাব থেকে যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে কাগজ-কলমে নিজে লেখার অভ্যাস বজায় রাখা অত্যাবশ্যক। এতে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে নিজস্ব মেধা ও চিন্তাশক্তিও দীর্ঘস্থায়ীভাবে টিকে থাকবে।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস