গণিতের প্রাণ হলো সমস্যা; আর কঠিন সমস্যাগুলোকে ঘিরে যুগে যুগে জেগে ওঠে প্রবল কৌতূহল। এই আগ্রহকে আরও উসকে দিতে উনিশ শতকে ঘোষণা করা হয় নানা লোভনীয় পুরস্কার, যেগুলোর পেছনে লুকিয়ে ছিল রাজনীতি, প্রতিযোগিতা ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব। আজ আমরা জানব সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো।

১৮০৩ সাল থেকে প্যারিসের পুনর্গঠিত একাডেমি অব সায়েন্সেস দুটি নতুন পুরস্কারের ঘোষণা দেয়—গ্র্যান্ড প্রি ডেস সায়েন্সেস ম্যাথমেটিকস এবং গ্র্যান্ড প্রি ডেস সায়েন্সেস ফিজিক্স। প্রতিটির অর্থমূল্য ছিল তিন হাজার ফরাসি ফ্র্যাঙ্ক, যা সে সময়ে একজন অধ্যাপকের প্রায় বার্ষিক বেতনের সমান ছিল। নিয়ম ছিল, এক বছর গণিতে ও পরের বছর পদার্থবিজ্ঞানে পুরস্কার দেওয়া হবে। তবে মাঝে মাঝে দেখা যেত অপ্রত্যাশিত প্রতিযোগিতা। ১৮০৯ সালে সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ‘স্থিতিস্থাপক পাতের কম্পন’ বিষয়ে একটি প্রতিযোগিতার প্রস্তাব করেন, যা প্যারিসে পদার্থবিজ্ঞানী আর্নস্ট ক্লাডনির পরীক্ষার পর তাঁর মাথায় আসে। বিচারকদের প্রধান ছিলেন পিয়ের-সিমোঁ ল্যাপলাস, যিনি তাঁর প্রিয় ছাত্র সিমিওন ডেনিস পয়সনকে সামনে আনতে চেয়েছিলেন।

১৮১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতা ঘোষণা হলে মাত্র একটি প্রবন্ধ জমা পড়ে—আর সেটি পয়সনের ছিল না, বরং অপরিচিত এক নারী সোফি জার্মেইনের। বিচারকেরা তাঁর সমাধানে ঘাটতি দেখিয়ে সময়সীমা ১৮১৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। সোফি নিজের কাজ আরও নিখুঁত করেন এবং এবারও একাই জমা দেন। তত দিনে আদ্রিয়েন-মারি লেজেন্ডারের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত চিঠিপত্র আদান-প্রদান শুরু হয়। লেজেন্ডার কিছুটা হতাশ হলেও সোফি সম্মানজনক স্বীকৃতি পান। প্রতিযোগিতার সময় আরও পিছিয়ে ১৮১৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নেওয়া হয়। ঠিক তখনই পয়সন নিজের প্রবন্ধ জমা দেন—অথচ তিনি ১৮১৩ সালে এই প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন! একজন বিচারক হয়ে একই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ছিল চরম নিয়মভঙ্গ। লেজেন্ডার এর তীব্র প্রতিবাদ করেন, তবু পয়সনের লেখা ইনস্টিটিউট ডি ফ্রান্সে পড়া ও ছাপা হয়; বলা হয় এটি অন্য প্রতিযোগীদের সাহায্য করবে। আসলে পয়সনের লক্ষ্য ছিল সমস্যাটিকে চিরতরে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়া। শেষমেশ প্রশ্নটি প্রতিযোগিতায় রেখেই দেওয়া হয় এবং ১৮১৫ সালে সোফি পরীক্ষামূলকভাবে কাজ উন্নত করে পুরস্কার জয় করেন।

এই ঘটনাই প্রমাণ করে, প্যারিসের অভিজাত বিজ্ঞানী মহলে পুরস্কার নিয়ে পর্দার আড়ালে কত রকম রাজনীতি চলত। হয়তো এই তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই ১৮১৫ সালে ফার্মার শেষ উপপাদ্যের ওপর পুরস্কার ঘোষণা হলে সোফি আর অংশ নেননি—আসলে কেউই অংশ নেননি। চার বছর পর বাধ্য হয়ে প্রশ্নটি তুলে নেওয়া হয়। তবে সোফির গবেষণা অয়লারের পর এবং জার্মান বিজ্ঞানী আর্নস্ট এডুয়ার্ড কুমারের আগের সময়ের মধ্যে সেরা কাজ হিসেবে স্বীকৃত হয়। ১৮৩০ সালে লেজেন্ডার তাঁর ‘থিওরি ডেস নমব্রেস’ বইয়ে সোফির কাজ প্রকাশ করলে তিনি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।

১৮১৫ সালের আরেকটি ঘটনাও বেশ মজার। তরঙ্গের বিস্তার নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে অগাস্টিন-লুই কশি একটি চমৎকার প্রবন্ধ লেখেন, যেখানে তিনি একটি ফাংশন ও তার ফুরিয়ার ট্রান্সফর্মের সম্পর্ক আবিষ্কার করেন—যদিও জোসেফ ফুরিয়ারের আগের কাজ সম্পর্কে তিনি একেবারেই জানতেন না। কশি জিতলেও তাঁর লেখা ১৮২৭ সালের আগে প্রকাশিত হয়নি। তত দিনে পয়সন স্বাধীনভাবে একই জিনিস আবিষ্কার করে দ্রুত প্রকাশ করেন, ফলে কশির কাজ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।

১৮১৯ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী অগাস্টিন-জ্যঁ ফ্রেসনেল আলোর তরঙ্গ তত্ত্বের জন্য পুরস্কার জিতে নেন, যা ছিল যুগান্তকারী। ১৮৩০ সালে ঘটে আরেক ব্যতিক্রমী ঘটনা: নিলস হেনরিক আবেল ও কার্ল গুস্তাভ জ্যাকোবিকে যৌথভাবে উপবৃত্তাকার ফাংশন আবিষ্কারের জন্য পুরস্কৃত করা হয়, যদিও এটি আগে থেকে ঘোষিত কোনো বিষয়ের ওপর ছিল না। লেজেন্ডার দেখলেন এই দুজন অসাধারণ কাজ করেছেন এবং অ্যাকাডেমিকে রাজি করিয়ে এই স্বীকৃতি দেন।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে নির্দিষ্ট শিরোনাম ও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া পুরস্কারের রেওয়াজ কমতে শুরু করে। এর বদলে কোনো নির্দিষ্ট শাখায় ইতিমধ্যে করা গুরুত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার দেওয়ার চল শুরু হয়। তবু ভালো উত্তর না এলে অ্যাকাডেমিগুলো মহাবিপদে পড়ত। ১৮১০ সালে ল্যাগ্রাঞ্জ ও ল্যাপলাস আলোর দ্বি-প্রতিসরণকে গ্র্যান্ড প্রির বিষয় হিসেবে প্রস্তাব করেন, কারণ তাঁরা জানতেন ৩৫ বছর বয়সী ইটিয়েন মালাস ঠিক এই বিষয়ে দারুণ কাজ করছেন। শেষ পর্যন্ত মালাসই জেতেন এবং গবেষণার একপর্যায়ে আলোর সমবর্তন আবিষ্কার করেন। ১৮১২ সালেও একই ঘটনা—তাপের বিস্তারের বিষয়ে সবাই জানতেন ফুরিয়ার কাজ করছেন; তিনিই জেতেন এবং তাঁর সেই কাজ গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

কিন্তু উনিশ শতক যত এগোতে থাকে, গ্র্যান্ড প্রির ভাগ্য তত খারাপ হতে থাকে। ১৮৪০ সালে ‘উপবৃত্তাকার কক্ষপথের বিচ্যুতি’ নিয়ে প্রশ্ন দেওয়া হলে উত্তর পেতে লেগে যায় ১৮৪৬ সাল পর্যন্ত, যা দেন হ্যানসেন। ১৮৫০ সালে কশির নেতৃত্বে ফার্মার শেষ উপপাদ্য নিয়ে আবার প্রশ্ন দেওয়া হয়, কিন্তু কোনো ভালো উত্তর না পেয়ে ১৮৫৩ সালে এটি বাতিল করা হয়। গ্যাব্রিয়েল ল্যামে ১৮৪৭ সালে ভুলবশত ভেবেছিলেন তিনি সাইক্লোটমিক সংখ্যা দিয়ে এটি প্রমাণ করেছেন, কিন্তু জোসেফ লিউভিল তাঁর ভুল ধরিয়ে দেন। কশি জেদ ধরেছিলেন যে তিনি সমাধান করতে পারবেন, কিন্তু শেষমেশ লিউভিল যখন কুমারের গভীর ধারণাগুলো ফ্রান্সে নিয়ে আসেন, তখন সবাই বুঝতে পারে সমস্যাটি কত কঠিন।

১৮৫৮ সালে ‘অসীম বস্তুতে তাপের বিস্তার’ নিয়ে প্রশ্ন দেওয়া হলেও কোনো উত্তর না পেয়ে ১৮৬৮ সালে এটি বাতিল হয়। বার্নহার্ড রিম্যান একটি সমাধান জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু বিচারকেরা রায় দেন তাঁর পদ্ধতি যথেষ্ট পরিষ্কার নয়; তাই তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। ১৮৬৫, ১৮৬৭, ১৮৭২, ১৮৭৪ ও ১৮৭৮ সালেও অ্যাকাডেমি পরপর জটিল প্রশ্ন দেয়, কিন্তু কোনোটির উত্তর আসেনি। অবশ্য এর মাঝে কিছু সাফল্যও ছিল। ১৮৮০ সালে ‘লিনিয়ার অর্ডিনারি ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশনের তত্ত্বের উন্নতি’ নিয়ে জর্জেস-অঁরি হ্যালফেন চমৎকার প্রবন্ধ লিখে পুরস্কার জেতেন। তবে প্রতিযোগিতাটি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী অঁরি পোয়াঁকারের কাজের জন্য—অটোমরফিক ফাংশন ও নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির সঙ্গে রিম্যান সারফেসের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর অসাধারণ গবেষণা আজও গণিতবিদদের মুগ্ধ করে।

১৮৮২ সালে প্যারিস অ্যাকাডেমি এক চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। ক্যামিল জর্ডানের নেতৃত্বে তারা প্রশ্ন দিয়েছিল, একটি সংখ্যাকে পাঁচটি বর্গের যোগফল হিসেবে কতভাবে লেখা যায়? ১৮ বছর বয়সী তরুণ জার্মান গণিতবিদ হারম্যান মিনকভস্কি ও ইংরেজ গণিতবিদ এইচ. জে. এস. স্মিথ যৌথভাবে জেতেন। কিন্তু গোল বাধে অন্য জায়গায়—স্মিথ তাঁর প্রবন্ধে শুধু প্রমাণ করেন যে তিনি অনেক আগেই এই সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন! সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার হলো, পুরস্কার ঘোষণার আগেই স্মিথ মারা যান। সমালোচকেরা লাফিয়ে উঠে বলেন, মিনকভস্কি নিশ্চয়ই স্মিথের কাজ চুরি করেছেন; কারণ এত কম বয়সে কারও পক্ষে এত বড় কাজ সম্ভব নয়। পরিস্থিতি এত খারাপ হয় যে জাতিবিদ্বেষের সুরও শোনা যায়। শেষ পর্যন্ত অ্যাকাডেমি তদন্ত করে ঘোষণা করে, মিনকভস্কি কারও সাহায্য ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ মিথ্যা। এই মিনকভস্কিই পরে আলবার্ট আইনস্টাইনের শিক্ষক হন—জুরিখ পলিটেকনিকে আইনস্টাইনের গণিতের অধ্যাপক ছিলেন তিনি।

১৮৯২ সালে চার্লস হারমাইট অ্যাকাডেমিকে রাজি করান মৌলিক সংখ্যার উপপাদ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল বন্ধু থমাস স্টিলজেসকে দিয়ে ১৮৮৫ সালে করা রিম্যান হাইপোথিসিস সমাধানের দাবির বিস্তারিত লেখানো। কিন্তু স্টিলজেস কোনো প্রবন্ধ জমা দিতে পারেননি, কারণ তিনি আসলে প্রমাণ করতে পারেননি—শুধু দাবি করেছিলেন। এর বদলে তরুণ জ্যাক হ্যাডামার্ড তাঁর পিএইচডি থিসিস জমা দিলে হারমাইট তাঁকে বলেন, এই থিসিসের কোনো বাস্তব প্রয়োগ খুঁজে বের করতে। হ্যাডামার্ড প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে খেয়াল করেন, তাঁর নতুন তত্ত্বটিই মৌলিক সংখ্যার উপপাদ্য প্রমাণের মূল চাবিকাঠি! তিনি একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ জমা দেন এবং ১৮৯২ সালের ১৯ ডিসেম্বর পুরস্কার জিতে নেন।

উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে কিছু নতুন পুরস্কার চালু হতে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল রাশিয়ার কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের লোবাচেভস্কি প্রাইজ, যা নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির অন্যতম আবিষ্কারক নিকোলাই লোবাচেভস্কির সম্মানে চালু হয়। ১৯০৪ সালে বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ অঁরি পোয়াঁকারের জোরালো সুপারিশে ডেভিড হিলবার্ট এই পুরস্কার জেতেন। আবার ১৯০৫ সালে হিলবার্টের সুপারিশে পোয়াঁকারে জেতেন হাঙ্গেরিয়ান অ্যাকাডেমির বোলিয়াই প্রাইজ। ১৯১০ সালে পোয়াঁকারে পাল্টা সুপারিশ করে হিলবার্টকে দ্বিতীয় বোলিয়াই প্রাইজ জিতিয়ে দেন—বিজ্ঞানীদের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল সত্যিই চমৎকার।

কিন্তু এত কিছুর পরও একটি বড় আক্ষেপ রয়েই যায়—বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সম্মান নোবেল পুরস্কারে গণিতের জন্য কোনো জায়গা রাখা হয়নি। অনেকেই বলেন, সুইডিশ গণিতবিদ মিটাগ-লেফলারের সঙ্গে আলফ্রেড নোবেলের ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণেই নোবেল তাঁর উইলে গণিতকে রাখেননি। গণিতবিদেরা এতে বেশ হতাশ হন; বিশেষ করে সুইডেনের অ্যাকাডেমির মানুষেরা আশা করেছিলেন, নোবেল হয়তো তাদের জন্য বিশাল কোনো তহবিল রেখে যাবেন। কিন্তু তা না হওয়ায় তারা একে ‘নোবেল ফ্লপ’ বলে আক্ষেপ করেন। এই অভাব পূরণের জন্যই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চালু হয় গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল, যা কানাডিয়ান গণিতবিদ জন চার্লস ফিল্ডসের স্মৃতিতে প্রবর্তিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিক কারণে ১৯২৪ সালের টরেন্টো কংগ্রেসে জার্মান গণিতবিদদের আসতে দেওয়া হয়নি; ফিল্ডস নিজে জার্মানিতে পড়াশোনা করেছিলেন বলে এই ঘটনায় খুব কষ্ট পান। তাঁর মৃত্যুর চার বছর পর, ১৯৩৬ সালে অসলোতে প্রথমবার ফিল্ডস মেডেল দেওয়া হয়। প্রতি চার বছর পর পর দেওয়া হয় এই মেডেল এবং প্রথা অনুযায়ী শুধু ৪০ বছরের কম বয়সী গণিতবিদদেরই দেওয়া হয়।

এদিকে ১৮৫০ সাল নাগাদ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ফ্রান্সের মোট ১৩টি পুরস্কার ছিল। ১৮৭০-৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্সের শোচনীয় পরাজয়ের পর এই সংখ্যা আরও বাড়ে। ফরাসিরা বিশ্বাস করতে শুরু করে, বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়ার কারণেই তাদের এই পরাজয় দেখতে হয়েছে। তাই বিজ্ঞানীদের উৎসাহ দিতে নতুন পুরস্কারগুলো মেডেলের বদলে নগদ অর্থে দেওয়ার নিয়ম করা হয়, যা গবেষণার কাজে দারুণ সাহায্য করে। নির্দিষ্ট পুরস্কারগুলোর মধ্যে প্রিক্স পনসেলেট ও প্রিক্স বর্ডিন ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত। ১৮৬৮ সালে জেনারেল জ্যঁ-ভিক্টর পনসেলেটের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীর দেওয়া অর্থে ১৮৭৬ সালে প্রিক্স পনসেলেট চালু হয়। আর ১৮৩৫ সালে চার্লস-লরেন বর্ডিনের রেখে যাওয়া ১২ হাজার ফ্রাঙ্ক দিয়ে ১৮৫৪ সালে শুরু হয় প্রিক্স বর্ডিন।

১৮৮৮ সালের প্রিক্স বর্ডিনের গল্পটি একটু অন্য রকম। সেবার বিষয় ছিল, একটি কঠিন বস্তুর গতির তত্ত্বকে উন্নত করা। চিঠি চালাচালি থেকে পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়, বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছিল মূলত রাশিয়ান গণিতবিদ সোফিয়া কোভালেভস্কির গবেষণার কথা মাথায় রেখে! কোভালেভস্কি তাঁর এক চিঠিতে লিখেছিলেন, হারমাইট, পিকার্ড, হ্যালফেন ও ডারবক্সের মতো রথী-মহারথীরা তাঁকে ডিনারে ডেকে বলেছেন, তিনিই এই পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন! কোভালেভস্কি যাতে প্রবন্ধ জমা দিতে পারেন, সেজন্য বিচারকেরা ডেডলাইনও পিছিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরে পুরস্কারটি জেতেন কোভালেভস্কিই। তিনি দেখান কীভাবে অ্যাবেলিয়ান ফাংশনকে কাজে লাগিয়ে কঠিন বস্তুর গতির জটিল সমস্যাগুলো মেটানো যায়।

বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেইনার প্রাইজের গল্প শুনলে বোঝা যায়, পুরস্কার দেওয়া মাঝে মাঝে কতটা যন্ত্রণার হতে পারে। ১৮৬৩ সালে বিখ্যাত জ্যামিতিবিদ জ্যাকব স্টেইনার মারা যাওয়ার পর তাঁর দেওয়া অর্থে এই পুরস্কার চালু হয়। শর্ত ছিল, প্রতি দুই বছর অন্তর সিনথেটিক জ্যামিতির ওপর ৮ হাজার থ্যালার পুরস্কার দেওয়া হবে। ১৮৬৪ ও ১৮৬৮ সালে পুরস্কারটি সুন্দরভাবে দেওয়া গেলেও, এরপর শুরু হয় খরা। ১৮৭০ সালে ‘সারফেসের লাইন্স অব কার্ভেচার’ নিয়ে প্রশ্ন দেওয়া হলে কোনো উত্তরই আসেনি; ১৮৭৪, ১৮৭৬ ও ১৮৮০ সালেও একই দশা। বিচারকেরা বাধ্য হয়ে ডেডলাইন পিছিয়েছেন এবং আগের কোনো ভালো কাজের জন্য সান্ত্বনা পুরস্কার দিয়েছেন। অবশেষে ১৮৮২ সালে ম্যাক্স নোয়েদার ও হেনরি হ্যালফেন একটি প্রশ্নের চমৎকার উত্তর দিয়ে পুরস্কার জেতেন। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে ১৮৮৯ সালে স্টেইনার প্রাইজের নিয়ম শিথিল করা হয়—এখন থেকে পাঁচ বছর পর পর দেওয়া হবে এবং ভালো উত্তর না পেলে গত ১০ বছরের কোনো দারুণ কাজকে পুরস্কৃত করা হবে। এভাবেই ১৯০০ সালে ডেভিড হিলবার্ট তাঁর বিখ্যাত বই ‘গ্রুন্ডল্যাগেন ডের জিওমেট্রি’ বা বাংলায় ‘জ্যামিতির ভিত্তি’র জন্য এই পুরস্কারের এক-তৃতীয়াংশ জিতেছিলেন।

বার্লিন অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। ১৮৩৬ সাল থেকে শুরু করে ১৮৬৪ সাল পর্যন্ত একের পর এক কঠিন প্রশ্ন দেওয়া হলেও কোনো উত্তর আসেনি। বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর অ্যাকাডেমি ১৮৬৪ সাল থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়াই বন্ধ করে দেয়; প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের এই দুর্দশা চলতেই থাকে। অন্যদিকে লিপজিগের জাবলোনোস্কি সোসাইটি বেশ সফলভাবে পুরস্কার পরিচালনা করেছিল। ১৭৭৪ সালে পোলিশ রাজপুত্র জাবলোনোস্কি এটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা এটি পরিচালনা করতেন। ১৮৪৬ সালে গটিংগেন সেভেন নামে পরিচিত সাতজন অধ্যাপককে রাজনৈতিক কারণে গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়; তাঁরা সবাই লিপজিগে চলে আসেন এবং সেখানকার বিজ্ঞানচর্চার মান অনেক বাড়িয়ে দেন। এই সোসাইটি বেশ কিছু দারুণ গাণিতিক সমস্যার সফল সমাধান বের করে আনতে পেরেছিল।

ডেনিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বেশ কিছু পুরস্কার দেয়। ১৮২৩ সালে ‘একটি সারফেসের ওপর আরেকটির কনফর্মাল রিপ্রেজেন্টেশন’ নিয়ে প্রবন্ধ লিখে পুরস্কার জেতেন বিখ্যাত গণিতবিদ কার্ল ফ্রেডরিক গাউস। মজার ব্যাপার হলো, এই প্রতিযোগিতার প্রশ্নটি স্বয়ং গাউসই তৈরি করেছিলেন! প্রশ্ন তৈরি করার পর তিনি দুই বছর চুপচাপ বসে ছিলেন, তারপর নিজের প্রবন্ধ জমা দিয়ে পুরস্কারটি জিতে নেন।

পুরস্কারের ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটি ঘটেছিল সুইডেনে। রাজা দ্বিতীয় অস্কারের ৬০তম জন্মদিন উপলক্ষে সুইডিশ গণিতবিদ মিটাগ-লেফলার একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। বিচারক হিসেবে ছিলেন ওয়ায়ারস্ট্রাস ও হারমাইট। থ্রি-বডি প্রবলেমের ওপর দুর্দান্ত এক প্রবন্ধ জমা দিয়ে বিজয়ী হন অঁরি পোয়াঁকারে। কিন্তু সমস্যা বাঁধে যখন প্রবন্ধটি ছাপানোর জন্য প্রেসে পাঠানো হয়। মিটাগ-লেফলারের সহকারী ফার্গমেন প্রবন্ধটি পড়তে গিয়ে কিছু ভুল দেখতে পান। পোয়াঁকারে বুঝতে পারেন, তাঁর প্রবন্ধে আসলেই বড়সড় একটা ভুল আছে! সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে মিটাগ-লেফলার দ্রুত ছাপানো বন্ধ করেন; এমনকি প্রবন্ধের ছাপানো সব কপিও পুড়িয়ে ফেলেন! এরপর পোয়াঁকারে তাঁর ভুল শুধরে নেন। সেই ভুল শুধরাতে গিয়েই তিনি এমন কিছু আবিষ্কার করে বসেন, যা বর্তমানে ক্যাওস থিওরি বা বিশৃঙ্খলা তত্ত্বের গাণিতিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। মিটাগ-লেফলার নতুন প্রবন্ধটি ছাপান ঠিকই, কিন্তু আগের কপিগুলো পুড়িয়ে ফেলার পুরো খরচ আদায় করেন পোয়াঁকারের কাছ থেকে; সেই ক্ষতিপূরণ ছিল তাঁর পুরস্কারের মূল টাকার চেয়েও বেশি! এই ঝামেলার পর রাজা অস্কার আর কোনো দিন গণিত প্রতিযোগিতার আয়োজন করেননি।

সবশেষ যে পুরস্কারটির কথা না বললেই নয়, সেটি হলো ভলফস্কেল প্রাইজ। পল ভলফস্কেল ছিলেন ধনী ইহুদি ব্যাংকার পরিবারের সন্তান ও পেশায় চিকিৎসক। কিন্তু মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস নামে এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে আর চিকিৎসাবিদ্যা চালিয়ে যেতে পারবেন না, তখন গণিতের প্রেমে পড়েন। বলা হয়, ১৯০৬ সালে মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর উইলে এক লাখ গোল্ড মার্ক রেখে যান। শর্ত ছিল, ২০৭৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যিনি ফার্মার শেষ উপপাদ্যের নিখুঁত সমাধান দিতে পারবেন, তাঁকে এই টাকা দেওয়া হবে। পুরস্কারটি চালুর প্রথম বছরেই ৬২১টি সমাধান জমা পড়ে—কিন্তু সেগুলো ছিল ভুল সমাধান। এরপর তা বাড়তে বাড়তে প্রায় পাঁচ হাজারে গিয়ে পৌঁছায়। গটিংগেন রয়্যাল সোসাইটির মানুষদের এই প্রবন্ধগুলোর ভুল ধরতে ধরতে জীবন জেরবার হয়ে যেত। বার্লিন অ্যাকাডেমির হয়ে আলবার্ট ফ্লেক নামে এক চিকিৎসক এতগুলো প্রবন্ধের ভুল ধরেছিলেন যে, তাঁকে ১৯১৫ সালে লিবনিজ মেডেল দিয়ে সম্মানিত করা হয়। গণিতবিদেরা ফ্লেকের এই বিশাল কাজকে মজা করে বলতেন ‘ফার্মা ক্লিনিক’। দীর্ঘ ৯১ বছর পর, ১৯৯৭ সালে সত্যি সত্যিই ফার্মার শেষ উপপাদ্যের সমাধান করেন অ্যান্ড্রু ওয়াইলস। তবে তত দিনে জার্মান মুদ্রাস্ফীতির কারণে এক লাখ গোল্ড মার্কের আসল মূল্য কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৭৫ হাজার ডয়েচ মার্কে—যা তখন প্রায় ৩৭ হাজার মার্কিন ডলারের সমান ছিল। যদি এক লাখ গোল্ড মার্ক দিয়ে সোনা কিনে রাখা হতো, তবে এর দাম হতো প্রায় ১৪ লাখ ডলার।

আগে থেকে বিষয় ঠিক করে দিয়ে পুরস্কার ঘোষণার এই প্রথা যখন ধীরে ধীরে ব্যর্থ হতে শুরু করল, তখন এর মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে সফল চেষ্টাটি করেছিলেন জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট। ১৯০০ সালে প্যারিসে বসেছিল গণিতবিদদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেস। সেখানেই হিলবার্ট তাঁর বিখ্যাত ২৩টি সমস্যার তালিকা তুলে ধরেন, যা পুরো বিংশ শতাব্দীর গণিতের গতিপথ ঠিক করে দিয়েছিল। হিলবার্টকে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিতে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হারম্যান মিনকভস্কি। তিনি হিলবার্টকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ভবিষ্যতের দিকে উঁকি দেওয়ার এই চেষ্টা দারুণ আকর্ষণীয় হবে। হিলবার্টের সমস্যাগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, এগুলোর কোনো ডেডলাইন ছিল না। তিনি শুধু পথটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি মেনে নিয়েছিলেন—কোনো কিছু ‘করা সম্ভব নয়’, গাণিতিকভাবে এটা প্রমাণ করতে পারলেও তা একটি সফল সমাধান হিসেবেই ধরা হবে। যেমন আবেল ও গ্যালোয়েস প্রমাণ করেছিলেন, পঞ্চম ঘাতের সমীকরণ সাধারণ বীজগণিতের সূত্র দিয়ে সমাধান করা যায় না; এটিও ছিল গণিতের বিশাল অর্জন। হিলবার্ট বিশ্বাস করতেন, যেকোনো সমস্যারই সমাধান সম্ভব। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘গণিতে কখনো জানা যাবে না বলে কিছু নেই!’ যদিও তাঁর অনুমানও মাঝে মাঝে ভুল হতো—তিনি ভেবেছিলেন রিম্যান হাইপোথিসিসের সমাধান হয়তো খুব দ্রুতই হয়ে যাবে, অথচ এক শতাব্দীর বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এটি আজও অমীমাংসিত।

এইভাবেই উনিশ শতকে ফরাসি ও অন্যান্য ইউরোপীয় পুরস্কারগুলো একের পর এক ইতিহাস গড়তে থাকে। রাজনীতি, ভুল, সংশোধন ও নতুন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে গণিতের এই অনন্য যাত্রা।