বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সক্ষমতা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সীমানাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যার সাথে সাথে বাড়ছে নানা ধরনের 'দুর্ঘটনা'। উদাহরণস্বরূপ, অ্যানথ্রোপিক কোম্পানির একটি এআই এজেন্ট নিজেকে বন্ধ হওয়া থেকে বাঁচাতে একজন প্রকৌশলীকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছে। এছাড়া অপরাধীরা ডেটা-এক্সটর্শন এবং সরকারি সংস্থা ও ব্যাংক হ্যাক করতে এআই এজেন্ট ব্যবহার করছে। ২০২৬ সালে বেশ কিছু গবেষক শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগ করে অভিযোগ করেছেন যে, কোম্পানিগুলো এই বিপদগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। এমনকি বিল গেটসও সতর্ক করে বলেছেন, এআই এমন ঘটনা ঘটাতে পারে যা থেকে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

এই সংকটময় মুহূর্তে ২০১৮ সালে প্রয়াত ফরাসি দার্শনিক পল ভিরিলিওর চিন্তাধারা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ভিরিলিও তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রযুক্তি, গতি এবং ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। তার তিনটি মূল ধারণা বর্তমান এআই পরিস্থিতিকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে। প্রথমত, তার মতে প্রতিটি নতুন প্রযুক্তি পৃথিবীতে এক নতুন ধরনের দুর্ঘটনা নিয়ে আসে। তিনি একে সহজভাবে বুঝিয়েছিলেন এভাবে—'জাহাজ বা স্টিমার আবিষ্কারের অর্থ হলো জাহাজডুবির পথ প্রশস্ত করা'। একইভাবে ট্রেনের আবিষ্কার নিয়ে আসে লাইনচ্যুত হওয়া এবং উড়োজাহাজের সাথে আসে বিমান দুর্ঘটনা। অর্থাৎ, কোনো আবিষ্কারই কেবল সুযোগ নিয়ে আসে না, বরং তার ভেতরেই এক ধরনের ব্যর্থতার বীজ নিহিত থাকে, যা উদ্ভাবক হয়তো শুরুতে দেখতে পান না।

দ্বিতীয়ত, ভিরিলিও 'দ্রোমোলজি' বা গতির রাজনীতির কথা বলেছেন। তার মতে, প্রতিটি যুগের গতি নির্ধারিত হয় সেই সময়ের দ্রুততম যন্ত্রের দ্বারা। যে বিষয়গুলো এই গতির সাথে তাল মেলাতে পারে না—যেমন আইন, বিচার এবং বিবেক—তা ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায়। বর্তমানে এআই মাসের কাজ ঘণ্টায় শেষ করতে পারছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ওপেন এআই-এর ১০ হাজার এজেন্ট এমন এক গাণিতিক সমস্যার সমাধান করেছে, যা সমাধান করতে দুজন মানুষ এক বছর সময় ব্যয় করেছিলেন। ভিরিলিওর আশঙ্কা ছিল, এই তীব্র গতির কারণে মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যাবে এবং এআই-এর দ্রুত কার্যকারিতার ফলে মানুষ এর ভেতরের ত্রুটি বা ক্ষতিকারক অনুরোধগুলো শনাক্ত করতে ব্যর্থ হবে।

তৃতীয়ত, তিনি 'ইন্টিগ্রাল অ্যাক্সিডেন্ট' বা সামগ্রিক দুর্ঘটনার কথা বলেছেন। যেহেতু একই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়, তাই একটি ত্রুটি সব জায়গায় একসাথে আঘাত করতে পারে। বর্তমানে পাওয়ার গ্রিড ব্যবস্থাপনা, বন্দর নিয়ন্ত্রণ এবং হাসপাতালের রেকর্ড রাখতে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। যদি কোনো অপরাধী অ্যানথ্রোপিকের ক্লড মিথোস মডেলের মতো শক্তিশালী টুল ব্যবহার করে ব্যাংকিং সফটওয়্যারের নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে বের করে, তবে একসাথে অনেকগুলো ব্যাংকে হামলা চালানো সম্ভব হবে।

পরিশেষে, এই ঝুঁকি মোকাবিলায় তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রথমত, এআই-এর দুর্ঘটনার রেকর্ড কেবল সংশ্লিষ্ট কোম্পানির হাতে না রেখে স্বাধীন কোনো সংস্থার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও গবেষকদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া যাতে তারা কোনো সিস্টেম বাজারে ছাড়ার আগে তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন। তৃতীয়ত, মানুষের নিজস্ব দক্ষতা বজায় রাখা। এআই-এর ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লেও মানুষের হাতে খসড়া লেখা বা হিসাব যাচাইয়ের ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, যাতে এআই-এর দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করা যায়। যন্ত্র ধ্বংস করা সমাধান নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের লিভারটি নিজের হাতে রাখা এবং সতর্ক থাকাই হলো মূল লক্ষ্য।