কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোর সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে উপনীত হয়েছে হোয়াইট হাউস। গত ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এই সমঝোতা অনুযায়ী, এআই ডেভেলপারদের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করতে হবে, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে এবং সেই ব্যবস্থাগুলো কার্যকর কি না তা যাচাই করতে বাইরের কোনো অডিটর বা মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করতে হবে। দীর্ঘকাল ধরে এআই কোম্পানিগুলো নিজেদের প্রযুক্তির মূল্যায়ন নিজেরাই করে আসছিল, সেই হিসেবে এই পদক্ষেপটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই চুক্তির একটি বড় দুর্বলতা বা 'লুপহোল' নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। চুক্তিতে স্বাধীন মূল্যায়নের কথা বলা হলেও, কারা এই মূল্যায়নের যোগ্য হবেন, 'স্বাধীনতা' বা নিরপেক্ষতার প্রকৃত সংজ্ঞা কী এবং স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশিকা দেওয়া হয়নি। এই মানদণ্ডের অভাবে দুটি কোম্পানি একই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেও তাদের মূল্যায়নের গভীরতা এবং নিরপেক্ষতার স্তরে ব্যাপক পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এই ফলাফলের ওপর কতটা ভরসা করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

শেলম্যান-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মতে, আর্থিক প্রতিবেদন, সাইবার নিরাপত্তা বা প্রাইভেসির ক্ষেত্রে দশকের পর দশক ধরে দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতার কঠোর মানদণ্ড তৈরি করা হয়েছে। এআই খাতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বচ্ছতা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা মূল্যায়ন করে যা তারা নিজেই ডিজাইন করতে সাহায্য করেছে, তবে সেই প্রতিবেদনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এছাড়া মূল্যায়নের পরিধি (scope) যদি খুব সীমিত হয়, তবে গ্রাহকরা ভুল করে মনে করতে পারেন যে পুরো সিস্টেমটিই নিরাপদ। তাই নির্বাহী কর্মকর্তাদের জন্য এটি জানা জরুরি যে, মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সঠিক দক্ষতা ছিল কি না এবং তারা কোন বিষয়গুলো পরীক্ষা করেছে আর কোনগুলো বাদ দিয়েছে।

একটি বিশ্বাসযোগ্য মূল্যায়নের জন্য মূল্যায়নকারীকে পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহের সুযোগ পেতে হবে এবং কোনো চাপ ছাড়াই নেতিবাচক ফলাফল রিপোর্ট করার স্বাধীনতা থাকতে হবে। বিশেষ করে যখন কোনো গুরুতর সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি ধরা পড়ে, তখন ডেভেলপার কোম্পানির চাপের মুখে পড়ে সেই রিপোর্টটি হালকা করে লেখা উচিত নয়। সঠিক বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে এই কাজ করা প্রয়োজন; যেখানে কারিগরি বিশেষজ্ঞরা মডেলের আচরণ ও আক্রমণ পরিস্থিতি বুঝবেন, আর নিশ্চয়তা প্রদানকারী পেশাদাররা শাসনব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ যাচাই করবেন।

ইতিমধ্যেই এই প্রক্রিয়ায় কিছু অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। AICPA এবং AIUC যৌথভাবে SOC 2 পরীক্ষা এবং AIUC-1 সার্টিফিকেশনের সমন্বয়ে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে, যা ঝুঁকি অনুযায়ী ত্রৈমাসিক পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেয়। তবে শুধুমাত্র উন্নত পদ্ধতি যথেষ্ট নয়, মূল্যায়নকারীদের জবাবদিহিতা এবং নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা জরুরি।

পরিশেষে, হোয়াইট হাউসের এই উদ্যোগকে সফল করতে হলে মূল্যায়নকারীদের ন্যূনতম যোগ্যতা, স্বচ্ছ পদ্ধতি এবং স্বার্থের সংঘাত প্রকাশের নিয়মাবলী নির্ধারণ করতে হবে। একইসাথে এই মানদণ্ডগুলো যেন ছোট ডেভেলপার কোম্পানিগুলোর জন্য সাধ্যের বাইরে না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, এআই সিস্টেমগুলো যত বেশি দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে, তাদের মূল্যায়নকারীদের মানদণ্ডও তত বেশি কঠোর হতে হবে। অন্যথায়, মূল্যায়ন হয়েছে বলে দেখানো হবে, কিন্তু তার বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না।