কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সময়ে মার্কিন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আশঙ্কাজনকভাবে ধীরগতিতে এগোচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি অ্যানথ্রোপিক-এর গবেষক জ্যাকব কক্সন এআই-এর কারণে মানবজাতির অস্তিত্ব সংকটের আশঙ্কা করে পদত্যাগ করেন এবং সিইও দারিও আমোদে ই এআই-এর গতি কমিয়ে আনার পক্ষে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। স্যাম অল্টম্যান এবং এলন মাস্কের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা এই সতর্কবার্তাকে সমর্থন করলেও, সরকারিভাবে এআই-এর উন্নয়ন থামানোর সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি নিয়ন্ত্রণের অপেক্ষায় থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এআই-এর প্রভাব বুঝতে দেরি করে, তবে তারা মারাত্মক ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

আমেরিকার অনেক কোম্পানি এআই গ্রহণে পিছিয়ে থাকার পেছনে দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, এই প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তির অভাব। দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত সতর্কতা এবং আত্মরক্ষামূলক মানসিকতা। বর্তমানে প্রতিরক্ষা, খাদ্য বণ্টন, বিমা, উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের মতো বিভিন্ন খাতের নির্বাহী ও বোর্ড সদস্যরা এআই-এর সুযোগ ও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। একটি সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ৬৫ শতাংশ পাবলিক কোম্পানির ডিরেক্টরদের এজেন্ডায় এআই এখন শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে রয়েছে। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন; এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কোম্পানির মাত্র ২২ শতাংশ এবং রাসেল ৩০০০ কোম্পানির মাত্র ৬ শতাংশ তাদের বোর্ডে এআই তদারকির বিষয়টি প্রকাশ করেছে। এছাড়া মাত্র ২৯ শতাংশ নেতা মনে করেন যে, তাদের বোর্ডে এআই বাস্তবায়নের সঠিক বিশেষজ্ঞ পরামর্শদাতা রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস বা ফেডারেল রেগুলেটররা এখনও কোনো শক্ত নির্দেশিকা প্রদান না করায়, এআই মোতায়েনের বড় সিদ্ধান্তগুলো এখন সরাসরি বোর্ডরুমগুলোতে নেওয়া হচ্ছে। তবে তাড়াহুড়ো করে ভুল পথে এগোনোর ঝুঁকিও রয়েছে। ফোর্ড কোম্পানির উদাহরণ এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। তারা অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের বদলে এআই-চালিত ৯০০টি পরিদর্শন ক্যামেরা এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করেছিল, যা আশানুরূপ ফল দেয়নি। ফলে কোম্পানিটি সময় ও অর্থ উভয়ই হারিয়েছিল। পরবর্তীতে তারা অভিজ্ঞ নিরাপত্তা প্রকৌশলীদের পুনরায় নিয়োগ দেয় এবং তাদের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমগুলোকে প্রশিক্ষণ দেয়, যার ফলে তারা পুনরায় গাড়ির গুণমান ও নিরাপত্তার শীর্ষ র‍্যাঙ্কিংয়ে ফিরে আসতে সক্ষম হয়।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা একটি পর্যায়ক্রমিক কৌশলের কথা বলেছেন। প্রথম ধাপে প্রযুক্তি নয়, বরং কৌশলগত দূরদর্শিতা প্রয়োজন, যেখানে নেতৃত্বকে শিক্ষিত করা এবং ছোট পরিসরে পাইলট প্রজেক্ট চালু করার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে জটিল ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো তৈরি এবং বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন (ROI) নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই পর্যায়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের বদলে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি বা রিস্কিলিং-এর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সবশেষে, যখন কোম্পানিটি আত্মবিশ্বাসী হবে, তখন তারা পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তি এবং সম্পূর্ণ নতুন পণ্য তৈরির সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারবে।

সবশেষে বলা হয়েছে যে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে কে এআই তৈরি করছে তা নিয়ে, কিন্তু কে এটি কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে তা নিয়ে আলোচনা খুব কম। ওয়াশিংটন ডিসি যখন এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন করপোরেট বোর্ডগুলোর ওপর দায়িত্ব বর্তিয়েছে এই প্রযুক্তির সঠিক শাসন ও পরিচালনা নিশ্চিত করার। অন্যথায়, প্রতিযোগীরা যখন দৌড় শুরু করবে, তখন অনেক প্রতিষ্ঠান কেবল হামাগুড়ি দেওয়ার পর্যায়েই আটকে থাকবে।