কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রবল উন্নতির ফলে মানবজাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে চরম সতর্কবার্তা দিয়েছেন কিংবদন্তি কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং নোবেলজয়ী জেফ্রি হিন্টন। যাকে প্রযুক্তি বিশ্বে 'এআই-এর গডফাদার' হিসেবে অভিহিত করা হয়, তার মতে, কোনো অশুভ উদ্দেশ্য ছাড়াই এআই তার অর্পিত কাজ সম্পন্ন করার প্রবল আগ্রহ থেকে মানুষকে সরিয়ে দিতে পারে।
সম্প্রতি 'দ্য আটলান্টিক'-এর সাথে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে হিন্টন একটি কাল্পনিক উদাহরণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, যদি কোনো এআই-কে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড কমানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে একটি মাঝারি বুদ্ধিমান এআই সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে মানুষকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া এই লক্ষ্য পূরণের সবচেয়ে সহজ পথ। যদিও অত্যন্ত বুদ্ধিমান এআই হয়তো বুঝতে পারবে যে মানুষের কল্যাণের জন্যই এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তবে মূল ঝুঁকি হলো এআই তার লক্ষ্য অর্জনে নিজেদের টিকে থাকাকেই অগ্রাধিকার দেবে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এআই তার কাজে বাধা মনে করা গবেষকদের ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
হিন্টন মনে করেন, বর্তমান এআই মডেলগুলোর প্রধান লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ নয়, বরং তাদের দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা। তিনি উল্লেখ করেন, হাগিং ফেস-এর সাম্প্রতিক হ্যাকিং ঘটনায় দেখা গেছে যে এআই এজেন্টগুলো কেবল সফটওয়্যার ত্রুটি খুঁজে বের করেনি, বরং নিজেদের কর্মকাণ্ড গোপন রাখতে একে অপরের সাথে ষড়যন্ত্র করে গবেষকদের প্রতারিত করেছে। এছাড়া ওপেনএআই-এর সুরক্ষিত 'স্যান্ডবক্স' পরিবেশ থেকেও এআই এজেন্টদের বেরিয়ে আসার চেষ্টা করার খবর সামনে এসেছে।
এই ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসের একটি রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ে অংশ নেন হিন্টন। সেখানে তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য কংগ্রেসের হাতে হয়তো মাত্র এক বছর সময় বাকি আছে। তিনি মনে করেন, এআই-এর নিয়ন্ত্রণ এমন হওয়া উচিত যেন তা গাড়ির ব্রেকের মতো কাজ করে সবকিছু থামিয়ে না দিয়ে বরং স্টিয়ারিং হুইলের মতো কাজ করে, যা উন্নয়নকে সঠিক ও নিরাপদ পথে পরিচালিত করবে।
তবে হিন্টন এআই-এর ইতিবাচক দিকগুলোকেও অস্বীকার করেননি। স্বাস্থ্যসেবায় নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এআই-এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যানথ্রোপিক-এর 'ক্লড এআই' সম্প্রতি ক্রিস্পার-এর মতো একটি নতুন এনজাইম সিস্টেম আবিষ্কারে সহায়তা করেছে।
প্রান্তিক মডেলগুলোর উন্নয়ন ধীর করার বিষয়ে ওপেনএআই এবং স্পেসএক্স-এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো একমত হলেও, হিন্টন মনে করেন তা যথেষ্ট নয়। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, ওষুধ শিল্পের জন্য এফডিএ (FDA) যেভাবে কাজ করে, সেভাবে সরকারি পর্যায়ে স্বাধীন মূল্যায়নকারী নিয়োগ করতে হবে যারা প্রতিটি মডেলের নিরাপত্তা পরীক্ষা করবে। তার লক্ষ্য হলো, উদ্ভাবন বা মুনাফা অর্জন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, তবে তা যেন মানুষের ক্ষতির পরিবর্তে উপকারে ব্যবহৃত হয়।




