বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) নিয়ে যেমন ব্যাপক উৎসাহ রয়েছে, তেমনই রয়েছে চাকরি হারানো বা যন্ত্রের আধিপত্য নিয়ে আতঙ্ক। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের ২০২৬ সালের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এক বিশেষ বক্তৃতায় ভিন্নমত ব্যক্ত করেন প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক ফরিদ জাকারিয়া। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চেয়ে মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা বা 'হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স' (HI)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
জাকারিয়ার মতে, এআই হয়তো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রবন্ধ লিখতে পারে, গান তৈরি করতে পারে, জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান বা রোগ শনাক্তকরণে সহায়তা করতে পারে, এমনকি ভিডিও নির্মাণেও সক্ষম। তবে এই সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের কিছু সহজাত গুণ রয়েছে যা যন্ত্রের পক্ষে অর্জন করা অসম্ভব। তিনি উদাহরণ দিয়ে বোঝান যে, মানুষের মস্তিষ্ক মাত্র ১.৪ কেজি ওজনের একটি অঙ্গ এবং এটি অত্যন্ত স্বল্প শক্তিতে (প্রায় ২০ ওয়াট) কাজ করে। বিপরীতে, একটি উন্নত এআই সিস্টেম পরিচালনা করতে বিশাল ডেটা সেন্টার, অসংখ্য সার্ভার এবং বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজন হয়।
মানুষের শেখার প্রক্রিয়া এবং অনুভূতির গভীরতা এআই-এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বলে তিনি মনে করেন। একটি ছোট শিশু কোনো প্রোগ্রামিং ছাড়াই কেবল চারপাশের পরিবেশ, মা-বাবার কণ্ঠস্বর এবং পারস্পরিক মেলামেশার মাধ্যমে ভাষা ও আবেগ বুঝতে শেখে। একজন মানুষ অন্যের হাসির পেছনের আন্তরিকতা বা নীরবতার মধ্যস্থিত মন খারাপের সংকেত বুঝতে পারে, যা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
আবেগ এবং অভিজ্ঞতার পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফরিদ জাকারিয়া বলেন, এআই দিয়ে হয়তো একটি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ চিঠি বা দুঃখের কবিতা লিখিয়ে নেওয়া সম্ভব, কিন্তু সেই দুঃখটি প্রকৃতপক্ষে অনুভব করা কেবল মানুষের পক্ষেই সম্ভব। একজন লেখকের গল্পে যখন তাঁর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, আনন্দ-বেদনা এবং পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠে, তখনই তা পাঠকের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। নিখুঁত হওয়ার চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আবেগই লেখাকে বিশেষ করে তোলে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষের পাশাপাশি তিনি একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, আসল বিপদ কেবল যন্ত্রের মানুষের মতো হয়ে ওঠায় নয়, বরং মানুষ যদি নিজেই যন্ত্রের মতো হয়ে উঠতে চায়। যদি আমরা কেবল দ্রুত কাজ করা বা নির্ভুল তথ্য মনে রাখাকেই বুদ্ধিমত্তার মাপকাঠি ধরে নিই, তবে সহানুভূতি, বিচারবুদ্ধি, সাহস, ক্ষমা এবং বন্ধুত্বের মতো মানবিক গুণগুলো হারিয়ে যাবে।
পরিশেষে, তিনি নতুন প্রজন্মকে এআই-এর সঠিক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, জটিল বিষয় বুঝতে বা ভাষা শিখতে এআই-এর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে, তবে সব কাজ যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দিলে নিজস্ব চিন্তা করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই বই পড়া, পারস্পরিক আলোচনা এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে মানবিক সম্পর্কের চর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মূল বার্তা হলো—প্রযুক্তিকে কাজে লাগান, তবে নিজের বুদ্ধিমত্তা ও মানবিকতা যেন বিলীন না হয়।




