কুড়িগ্রামের চিলমারী ও রংপুরের তারাগঞ্জের দুজন মানুষের জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে আয়ের পরিমাণ ও তা ধরে রাখার মধ্যকার এক গভীর বৈপরীত্য। নূর আলম এবং আদম—দুজনই নিজ নিজ কাজে দক্ষ এবং একসময় প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন, তবে তাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কুড়িগ্রামের রমনা ইউনিয়নের নূর আলম প্রায় তিন দশক আগে সীমান্ত পেরিয়ে আসামের জোড়হাটে মাছ ধরতে শুরু করেছিলেন। সেই সময়ে পাসপোর্ট-ভিসার নিয়মকানুন বর্তমানের মতো কঠোর ছিল না। বংশপরম্পরায় তার পূর্বপুরুষরা সেখানে মাছ ধরতেন বলে তিনি জোড়হাটকে বেছে নেন। নূর আলমের মতে, সেখানে জলমহালের মালিক সাধারণত একজন হওয়ায় জেলেদের লভ্যাংশ বেশি থাকে। মাছের আয়ের ৬০ শতাংশ পান জেলেরা এবং ৪০ শতাংশ মালিকের কাছে যায়। আসামের নদীর বাস্তুসংস্থান এবং মাছ রক্ষায় নির্দিষ্ট সময়ের নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেখানে মাছের প্রাচুর্য বেশি এবং জীবনযাত্রার খরচ কম। দলবেঁধে মাছ ধরে নূর আলম কখনো এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন।

তবে এত বড় অংকের আয় করেও নূর আলমের জীবনে কোনো স্থায়ী সঞ্চয় আসেনি। তাঁর জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার। জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলে এবং অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসায় তিনি প্রায় ১৪-১৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। নিজস্ব কোনো জমি বা বাড়ি না থাকায় বড় ভাইয়ের দেওয়া সামান্য জমিতে একটি ঘর তুলেছেন। বর্তমানে তিনি বেকার এবং জীবনধারণের জন্য মাঝে মাঝে বালুর ট্রলারে কাজ করেন।

অন্যদিকে, রংপুরের তারাগঞ্জ থেকে আসা ৩৬ বছর বয়সী আদমের জীবন এক অনুপ্রেরণার গল্প। মাত্র ১১ বছর বয়সে অভাবের তাড়নায় ঘর ছাড়েন তিনি। দিনাজপুর, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সিলেট হয়ে অবশেষে কুড়িগ্রামে এসে থিতু হন। কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সাথে বাবুর্চির কাজ শিখে তিনি বর্তমানে কুড়িগ্রামের ঐশী রেস্তোরাঁয় কর্মরত। দৈনিক দেড় হাজার টাকা মজুরি পান তিনি, যা শীঘ্রই আরও বাড়বে বলে আশা করছেন। এছাড়া বিভিন্ন বিয়ের অনুষ্ঠানে রান্নার কাজ করে মাসে আরও ২০-২৫ হাজার টাকা আয় করেন এবং সেই অর্থ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেন।

আদমের এই সাফল্যের মূলে ছিল মায়ের কষ্ট এবং ক্ষুধার তাড়না। খড়ের ঘরে বৃষ্টির দিনে ভিজে যাওয়া থেকে শুরু করে আঁটিকলা সেদ্ধ করে ক্ষুধা মেটানোর স্মৃতি তাঁকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এছাড়া ওস্তাদ আশরাফের মতো একজন মেন্টরের সঠিক দিকনির্দেশনায় তিনি পেশাগত দক্ষতা অর্জন করেন। বর্তমানে আদমের পরিবার একটি পাকা বাড়িতে বাস করে এবং তাঁদের প্রায় ৬০ শতক জমি রয়েছে। এমনকি তিনি চারটি দোকানও প্রতিষ্ঠা করেছেন।

নূর আলম ও আদমের এই দুই জীবনের তুলনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল আয় বৃদ্ধিই জীবনমান উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি নয়। একজনের সঞ্চয়ের খাতা শূন্য, অন্যজনের পূর্ণ। এই বাস্তবচিত্রটি প্রমাণ করে যে, মাথাপিছু আয় বা জিডিপির মতো অর্থনৈতিক তত্ত্বের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সঞ্চয়ের সক্ষমতা। দক্ষ হয়েও কেন কেউ নিঃস্ব থাকে আর কেউ সমৃদ্ধ হয়, তা এই দুই চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে।