জীবনের লক্ষ্য আর বাস্তবতার টানাপোড়েন কীভাবে একজন মানুষের স্বপ্ন বদলে দেয় বা তাকে লড়াই করতে বাধ্য করে, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ পাওয়া যায় রাজশাহীর তিন তরুণের গল্পে। তাদের একজন মোহাম্মদ আলী, যার বাড়ি পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের মাড়িয়া গ্রামে। শৈশব থেকেই পাখি পোষার শখ ছিল তার, যা বর্তমানে একটি ছোট খামারে রূপ নিয়েছে। তবে শখের পাশাপাশি জীবনের তাগিদে তাকে বেছে নিতে হয়েছে মাছের ব্যবসা। গত আট বছর ধরে তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি মাছের আড়ত থেকে পণ্য কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করেন। সম্প্রতি তিনি রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) শেষ করেছেন। তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো শিক্ষকতা পেশায় আসা, তা সরকারি হোক বা বেসরকারি।
মোহাম্মদ আলীর জীবন সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন। বানেশ্বর বাজারের একটি ছোট ঘরে তিনি পড়াশোনা করেন, কারণ বাড়িতে অনুকূল পরিবেশ নেই। মার্কেটের মালিক তাকে বিনামূল্যে ওই ঘরটি ব্যবহার করতে দেন। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে তিন বোনের বিয়ের পর তাদের অসুস্থতা ও সংসারের দায়িত্ব এখন তার কাঁধেই। মাছের ব্যবসার পাশাপাশি তিনি তার পাখির খামার থেকেও আয় করার চেষ্টা করেন। বর্তমানে তার খামারে ৪০টি খাঁচায় পাখি রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি বাচ্চা বিক্রির উপযোগী হয়েছে। অনলাইন এবং আত্মীয়দের মাধ্যমে এই পাখি বিক্রি করে তিনি বাড়তি কিছু আয়ের আশা করছেন। ১৮ কিলোমিটার দূরে শহরের কলেজে যাতায়াত এবং পড়াশোনার এই দীর্ঘ লড়াই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন বাবার সহযোগিতায়।
অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন মায়িশা মাহজাবিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ইংলিশ ফর স্পিকারস অব আদার ল্যাঙ্গুয়েজেস' বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে তার লক্ষ্য ছিল অস্ট্রেলিয়া যাওয়া। আইএলটিএস পরীক্ষায় ভালো স্কোর থাকলেও পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। দেশের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতি এবং সমসাময়িকদের বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা তাকে বাইরে যাওয়ার দিকে উৎসাহিত করেছিল। তবে বর্তমানে বাস্তবতার সাথে আপস করে পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে তিনি বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ভাবছেন।
একইসাথে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটছেন ইশতিয়াক ফারুকী। গোদাগাড়ীর প্রসাদপাড়া গ্রামের এই তরুণের শিক্ষা জীবন ছিল শিক্ষকতার সাথে সম্পৃক্ত। রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড এবং এমএড শেষ করার পর তিনি একটি ডেভেলপার কোম্পানিতে কাজ শুরু করেছিলেন। শুরুতে দেশে থেকে স্বাবলম্বী হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তার পরিবার এখন তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে চায়। পরিবারের চাপে পড়ে শিক্ষকতার ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও ইশতিয়াক এখন গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, যাতে বিদেশে চালক হিসেবে কাজ পাওয়ার সুযোগ থাকে।
তিনটি ভিন্ন জীবনের এই গল্প আমাদের দেখায় যে, কারো স্বপ্ন টাকার অভাবে বদলে যায়, আবার কেউ পরিবারের সিদ্ধান্তে নিজের লক্ষ্য পরিবর্তন করেন। কেউ প্রতিকূলতার মাঝেও দেশে থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় দেশ ছাড়ার পথ খুঁজছেন। তবে পরিস্থিতির ভিন্নতা থাকলেও, জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইটা সবারই সমান।




