নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লালের মরদেহ নিয়ে দীর্ঘ ছয় দিন ধরে চলা পারিবারিক ও ধর্মীয় টানাপোড়েনের অবসান ঘটাল উচ্চ আদালত। হিন্দু পরিবারে জন্ম নিলেও পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা শুভর শেষকৃত্য কোন রীতিতে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে তাঁর মা ও বাবার মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। এই জটিলতার কারণে মরদেহটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অবশেষে বিচারপতি ইকবাল কবির ও বিচারপতি সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ তাঁকে ইসলামি রীতিতে দাফন করার আদেশ প্রদান করেন।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত ৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনের সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুভর মা পার্বতী রানী দাস এবং বাবা হরি চন্দ্র দাসের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ২০০৩ সালে মা পার্বতী রানী তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে আয়েশা বেগম রাখেন। একই সঙ্গে দুই ছেলের নামও পরিবর্তন করা হয়, যেখানে শুভর নতুন নাম রাখা হয় মো. বিল্লাল এবং ছোট ভাই সুজনের নাম হয় ইব্রাহিম। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) শুভর নাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। শুভর ভাই ইব্রাহিম জানান, শৈশব থেকেই শুভ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন এবং তাঁরা মুসলিম পরিচয়েই জীবনযাপন করে আসছিলেন। ২০১৮ সালে জ্যোতি আক্তার নামে এক মুসলিম তরুণীকে কাবিননামার মাধ্যমে বিয়ে করেন শুভ, তাঁদের সংসারে সুমাইয়া আক্তার নামে দুই বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান রয়েছে।

শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তার এবং মা ও ভাই দাবি করেন, মৃত্যুর আগে শুভ নিজেই তাঁর শেষকৃত্য মুসলিম রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। অন্যদিকে, শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাসের দাবি, যেহেতু শুভ একটি হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাই তাঁর শেষকৃত্য হিন্দু ধর্মীয় রীতিতেই হওয়া উচিত। এই বিরোধের ফলে মরদেহটি প্রথমে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় রাখা হয় এবং পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে তা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। দাফন বা দাহ নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হলে শুভর স্ত্রীর পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, মা ও বাবার মধ্যকার মতভেদের কারণে বিষয়টি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিল এবং বর্তমান নির্দেশনার ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রিটকারী আইনজীবী মো. জুয়েল আজাদ জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে আদেশ দেওয়া হলেও আদেশের কপি পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হয়েছে, যা রোববার কার্যদিবসের শুরুতেই পাওয়া যাবে। আদেশের কপি হাতে পাওয়ার পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফনের প্রস্তুতি নেবেন শুভর পরিবার।

এদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, ৫ সেপ্টেম্বর ঘটনাস্থল থেকে ৫টি গুলির খোসা এবং ১০০টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। ইয়াবার বিনিময়ে এক সহযোগীর মাধ্যমে শুভকে সেখানে ডেকে আনা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল তাঁকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং রিমান্ডে থাকা আসামির তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন জব্দ করা হয়েছে।