রাজধানীর লালমাটিয়ার জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নিউ কলোনি আবাসিক এলাকার একটি স্যাঁতসেঁতে ঘরের পাশে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা দেখা মেলে শনিবার সকালে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মশকনিধনকর্মীরা সেখানে ওষুধ ছিটিয়ে লার্ভা ধ্বংস করেন। কলোনি এলাকার আরও ছয়টি স্থানে লার্ভা পাওয়া যায়। এই এলাকাটি ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত এবং এটি ডেঙ্গুর ১০০টি হটস্পটের একটি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের ঠিকানা যাচাই করে ডিএনসিসি এই ১০০টি হটস্পট নির্ধারণ করেছে। গত ১৫ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রোগীদের তথ্য সংগ্রহ করে সংক্রমণ স্থানের ঘনত্ব বিশ্লেষণ করা হয়। মিরপুর-পল্লবী-কাফরুল ও মোহাম্মদপুর-আদাবর-শ্যামলী এলাকায় হটস্পটগুলোর বড় অংশ অবস্থিত। মিরপুর-২, বড়বাগ, মণিপুর, ৬০ ফিট, মিরপুর-১০, রোকেয়া সরণি, পাইকপাড়া, টোলারবাগ, আহমেদ নগর, দক্ষিণ বিশিল, দক্ষিণ পল্লবী, বাউনিয়াবাদ ও কাফরুলের কাজীপাড়া-শেওড়াপাড়া তালিকায় রয়েছে। মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক, পিসি কালচার, শ্যামলী, নবোদয় ও বাইতুল আমান হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, বছিলা, কাটাসুর, জাফরাবাদ ও রায়েরবাজারও হটস্পটের মধ্যে পড়েছে। মহাখালী-বনানী-গুলশান-করাইল থেকে বাড্ডা, রামপুরা, আফতাবনগর, সাতারকুল, ভাটারা, নূরের চালা ও দুমনি পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা তালিকাভুক্ত হয়েছে। উত্তরা, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, দিয়াবাড়ি, তুরাগ, কামারপাড়া, রাজাবাড়ী, ধউর, দক্ষিণখান ও আশকোনার আবাসিক এলাকা এবং নির্মাণাধীন স্থাপনাও হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
হাসপাতাল থেকে সংগৃহীত ১ হাজার ৬৭৮ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি রোগী মিরপুর এলাকার—৬০৭ জন, যা মোটের ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর মোহাম্মদপুরে ৩২১ জন (১৯ দশমিক ১ শতাংশ), কচুক্ষেত, ইব্রাহিমপুর ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ১৬৭ (৯ দশমিক ৯ শতাংশ), বাউনিয়ায় ১২৭ (৭ দশমিক ৬ শতাংশ), দক্ষিণখানে ৮৪ (৫ দশমিক ১ শতাংশ), মহাখালীতে ৮১ (৩ দশমিক ৮ শতাংশ), খিলক্ষেতে ৭৭ (৩ দশমিক ৬ শতাংশ), রায়েরবাজারে ৮৯ (৫ দশমিক ৪ শতাংশ), কাওলায় ৯৭ (৫ দশমিক ৮ শতাংশ) ও বসুন্ধরা এলাকায় ২৭ জন (১ দশমিক ৬ শতাংশ) ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে মে মাসে একটি জরিপ চালায়। ২ হাজার ২৫০টি বাড়ির তথ্য সংগ্রহ করে ২৯টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওয়ার্ডগুলো হলো ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১১, ১৩, ১৫, ১৭, ২০, ২১, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৮, ৩২, ৩৬, ৩৮, ৫২, ৫৫, ৫৬, ৫৭, ৬২, ৬৮, ৭০, ৭৩ ও ৭৪। ধানমন্ডি-কলাবাগান-শুক্রাবাদ, সেগুনবাগিচা-সচিবালয়, শাহবাগ-পরীবাগ-বাংলামোটর, খিলগাঁও-বাসাবো-মুগদা, লালবাগ-আজিমপুর-চকবাজার, পুরান ঢাকার সূত্রাপুর-কোতোয়ালি, যাত্রাবাড়ী-কদমতলী-কামরাঙ্গীরচর এবং ডেমরা-সারুলিয়া-দক্ষিণগাঁও-নন্দীপাড়ার বিভিন্ন এলাকা রয়েছে। জরিপে বহুতল ভবনে সবচেয়ে বেশি ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ লার্ভা শনাক্ত হয়। একক বাড়িতে ২৭ দশমিক ৭৬, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭ দশমিক ৪৪ এবং সেমি পাকা বাাড়িতে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ লার্ভা পাওয়া যায়। প্রজননস্থলের মধ্যে মেঝেতে জমে থাকা পানিতে ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ, বালতিতে ১০ দশমিক ৩৪ ও প্লাস্টিকের ড্রামে ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ লার্ভা পাওয়া যায়।
ডিএনসিসি চিহ্নিত ১০০টি হটস্পটে 'একশোতে একশো' কর্মসূচি শুরু করেছে। গতকাল লালমাটিয়ার নিউ কলোনি এলাকায় আটটি দল বিভক্ত হয়ে মশকনিধনকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কুইক রেসপন্স দলের সদস্য, রোভার স্কাউট ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করেন। তারা বাসাবাড়ি ও আঙিনায় জমে থাকা পানি খুঁজে দেখে লার্ভা ধ্বংস করেন। নিউ কলোনির সাতটি স্থানে লার্ভা পাওয়া যায়। পুরো ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৩টি স্থাপনা পরিদর্শন করে ৪২টিতে এডিসের লার্ভা পাওয়া যায়। মোহাম্মদপুরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে ৫১টি স্থাপনার মধ্যে ৩৬টিতে লার্ভা পাওয়া যায়।
ডিএসসিসি উচ্চ ঝুঁকির এলাকাগুলোতে 'উফপ' (উল্টান, ফেলুন, পরিষ্কার করুন) কর্মসূচি চালাচ্ছে। এর আওতায় শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে এডিস মশার প্রজননস্থল নষ্ট করা যায়। ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রতি শনিবার বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও 'ক্লিনিং ডে' চালু করা হয়েছে, যা আগামী তিন মাস চলবে। এছাড়া সচেতনতামূলক র্যালি ও বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, আগস্টে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বদলেছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। তবে তারা নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতি শনিবার 'ক্লিনিং ডে' পালন করছেন।
ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, তাদের উদ্দেশ্য মানুষকে সচেতন করা এবং এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে জনগণকে সম্পৃক্ত করা। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, দক্ষিণ সিটি মে মাসের তথ্য দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, যা খুব কার্যকর হবে না। রোগী ধরে হটস্পট শনাক্ত করা প্রয়োজন এবং উত্তর সিটিকেও দ্রুত সমন্বিতভাবে মশকনিধনের কাজ করতে হবে।
এ বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ৩১০ জন, মারা গেছেন ৫৪ জন। আগস্টে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে—আক্রান্ত ৩৫ হাজার ৮৪৬, মৃত্যু ৯৭ জন। সেপ্টেম্বরের ১৯ তারিখ পর্যন্ত ২৪ হাজার ৫৩৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ৮১ জন। সব মিলিয়ে এ বছর ৬০ হাজার ৩৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ১৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের শুরুকে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য পিক সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আজ ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবস। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণ এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ফেলে দেওয়া বোতল, প্লাস্টিকের পাত্র, টায়ারসহ বিভিন্ন বর্জ্যে পানি জমে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে। তাই শুধু মশার ওষুধ ছিটানো নয়, সম্ভাব্য প্রজননস্থল অপসারণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।




