ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চুরির সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক তোফাজ্জল হোসেনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই নৃশংস ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি, যা নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তোফাজ্জলের মামাতো বোন আসমা আক্তার তানিয়া ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ দুই বছর কেটে গেলেও বিচার শুরু না হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। মামলার বাদী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ আশা প্রকাশ করেছেন যে, প্রকৃত অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবেন।

তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম জানান, তদন্ত শেষে মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে, যা আদালত ইতিমধ্যে আমলে নিয়েছেন। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করা হলেও তাদের অবস্থান সম্পর্কে প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি। গত ২৩ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা না আসায় আদালত আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ ধার্য করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অভিযোগপত্রে আসামিদের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা দেওয়া আছে এবং সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্ব এখন পলাতক আসামিদের খুঁজে বের করা। অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জানান, মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে তা মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হবে, যেখানে অভিযোগ গঠন এবং সাক্ষীদের হাজির করার মাধ্যমে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হবে।

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে। অভিযোগ অনুযায়ী, তোফাজ্জল হোসেন ফজলুল হক হলের গেটে ঘোরাফেরা করায় তাকে সন্দেহ করে কিছু শিক্ষার্থী ধরে। প্রথমে তাকে অতিথি কক্ষে নিয়ে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে মারধর করা হয়। পরে তাকে মানসিক রোগী হিসেবে শনাক্ত করে হলের ক্যান্টিনে খাবার খাওয়ানো হয়। তবে এরপরেই তাকে দক্ষিণ ভবনের অতিথি কক্ষে নিয়ে জানালার সঙ্গে হাত বেঁধে স্ট্যাম্প, লাঠি ও হকিস্টিক দিয়ে নৃশংসভাবে মারধর করা হয়, যার ফলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে মারা যান। এই ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। ভিডিওতে দেখা যায়, নির্যাতনের আগে তাকে ভাত খাওয়ানো হয়েছিল, যা ঘটনাটিকে আরও বীভৎস করে তোলে। তানিয়া জানান, তিনি ফোন করে অনুরোধ করলেও শিক্ষার্থীরা তোফাজ্জলকে মুক্তি দেননি, বরং নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বরগুনার পাথরঘাটার বাসিন্দা তোফাজ্জল বরিশাল বিএম কলেজ থেকে হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেও মানসিক অসুস্থতার কারণে বেকার ছিলেন। তার বাবা ও মা এবং বড় ভাই নাসির হোসেন (পুলিশের এসআই) পর্যায়ক্রমে মারা যাওয়ার পর তার দেখার কেউ ছিল না। তাকে পাবনার মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শিকল ভেঙে পালিয়ে যাওয়ায় তিনি ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন।

মামলার বিস্তারিত তথ্যে দেখা যায়, প্রথমে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের হয় এবং তদন্তে ২১ শিক্ষার্থীর নাম আসলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নারাজির পর পিবিআই পুনরায় তদন্ত করে ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। আসামিদের তালিকায় মো. জালাল মিয়া, আহসান উল্লাহ, আল হোসাইন সাজ্জাদ এবং মোত্তাকিন সাকিন শাহসহ মোট ২৮ জনের নাম রয়েছে। এদের মধ্যে জালাল মিয়া ও সুমন মিয়া বর্তমানে কারাগারে এবং রেদোয়ানুর রহমান, রাশেদ কামালসহ নয়জন জামিনে মুক্ত। বাকি ১৭ জন এখনো পলাতক।