যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের ডেটা সেন্টার স্থাপনের প্রতি তীব্র নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশের পর বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন আনছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। দেশজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিপক্ষে গণমতের কথা মাথায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি একটি 'ন্যাশনাল কমিউনিটি কমপ্যাক্ট' প্রকাশ করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ওপেনএআই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তাদের মালিকানাধীন এবং পরিচালিত ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাসগুলোর বিদ্যুৎ খরচ এবং গ্রিড পরিকাঠামোর যাবতীয় ব্যয় তারা নিজেরাই বহন করবে।
কেবল খরচ বহনে নয়, বড় ধরনের বিনিয়োগ শুরু করার আগেই প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক গ্যারান্টি দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, কোনো প্রকল্প যদি মাঝপথে বাতিল বা বিলম্বিত হয়, তবে সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের যেন সেই আর্থিক ক্ষতির বোঝা বইতে না হয়। ওপেনএআই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই পরিকল্পনাটি দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে প্রস্তুত করা হচ্ছিল এবং অনেক ক্যাম্পাসে তারা ইতিমধ্যে এটি কার্যকর করেছে; তবে প্রথমবারের মতো এখন তা লিখিতভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলো। খনি বা জ্বালানি খাতের ভাষায় একে বলা হয় 'সোশ্যাল লাইসেন্স' বা সামাজিক বৈধতা। কোনো আইনি অনুমতি বা কর ছাড়ের মাধ্যমে এটি পাওয়া যায় না, বরং স্থানীয় মানুষের কাছে এটি প্রমাণ করতে হয় যে, প্রকল্পটির ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে অথবা অন্তত কোনো ক্ষতি হবে না।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রায় ৪০টি এলাকায় ডেটা সেন্টার নিয়ে ভোটাভুটি হয়েছিল, যার মধ্যে ২৫টি এলাকার ২৮টি প্রস্তাব পাস হয়েছে এবং প্রায় সবকটিই ছিল ডেটা সেন্টার বিরোধী। বিশেষ করে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে আশঙ্কাজনক, যেখানে ১৮টি পৌরসভায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিপক্ষে রায় গেছে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যামাজন ২ বিলিয়ন ডলারের একটি ক্যাম্পাস প্রস্তাব করার পর সানবারিতে ৭৯ শতাংশ ভোটার তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। একইভাবে ট্রেন্টন এবং হাবার্ডেও বড় আকারের ডেটা সেন্টার স্থাপনের বিপক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোট দিয়েছেন। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, ভোটাররা ডেটা সেন্টার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে চাননি, বরং এর আকার এবং প্রভাবের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে চেয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় সরকার থেকে কর ছাড় বা ট্যাক্স বেনিফিট পাওয়ার বিনিময়ে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিত। কিন্তু বর্তমান ভোটাররা আর এই মডেলে সন্তুষ্ট নন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ বিলের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশেরও বেশি আমেরিকান তাদের পাশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের বিরোধিতা করবেন, যার মূল কারণ বিদ্যুৎমূল্য বৃদ্ধি।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির মুখে এখন বড় কোম্পানিগুলো নতুন প্রস্তাব নিয়ে আসছে। মাইক্রোসফট ইতিমধ্যে 'কমিউনিটি-ফার্স্ট এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার' পরিকল্পনা চালু করেছে, যেখানে তারা কর ছাড় না চেয়ে পূর্ণ সম্পত্তি কর প্রদান, ব্যবহৃত পানির চেয়ে বেশি পানি পুনঃপূরণ এবং স্থানীয় স্কুল-কলেজে বিনামূল্যে এআই প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গুগল, মেটা, ওরাকল এবং অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও হোয়াইট হাউসের একটি অ-বাধ্যতামূলক অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেছে, যার লক্ষ্য হলো নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ নিজেরাই উৎপাদন বা সংগ্রহ করা। ফলে এখন আর স্থানীয় জনগণের ওপর গ্রিড আপগ্রেড বা পরিকাঠামোর খরচ চাপিয়ে না দিয়ে কোম্পানিগুলো নিজেরাই তা বহনের পথে হাঁটছে। যদিও কিছু রাজনৈতিক নেতা এআই উন্নয়নের ওপর স্থগিতাদেশ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন, তবে সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে যে ভোটাররা কেবল এই নির্মাণের ধরন এবং এর সামাজিক মূল্য পুনর্নির্ধারণ করতে চেয়েছেন।




