বাংলাদেশে দীর্ঘ এক দশক ইলিশের উৎপাদন বাড়ার পর গত দুই বছরে তা নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছিল, বর্তমানে তা কমে প্রায় ৫ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। ইলিশ গবেষক এবং বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানান, মাছের দাম বৃদ্ধি এবং আকারে ছোট হয়ে আসা দুটি ভিন্ন সংকেত দেয়। মূল্যবৃদ্ধি নির্দেশ করে যে বাজারে সরবরাহ কমছে, আর আকার ছোট হওয়া মানে মাছের মোট মজুত হ্রাস পাচ্ছে।

অধ্যাপক ওহাবের মতে, বর্তমান সংকটটি সাময়িক, তবে এর পেছনে প্রধানত দুটি কারণ কাজ করছে— প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা এবং নির্বিচারে জাটকা নিধন। তিনি উল্লেখ করেন, বৈজ্ঞানিকভাবে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ এবং জনসম্পৃক্ততা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে নিষিদ্ধ সময়ে সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল ব্যবহার এবং উপকূলীয় কাঠের নৌকায় ট্রলিংয়ের ব্যবস্থা ইলিশসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর পোনা ধ্বংস করছে।

নদীতে পলি জমে ডুবোচর তৈরি হওয়া এবং পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে ইলিশের চলাচলে প্রভাব পড়ছে কি না, তা নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। তবে অধ্যাপক ওহাব বিশ্বাস করেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা এবং জাহাজ চলাচলের প্রভাব মা ইলিশের প্রজনন ও পোনার বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে। তাঁর মতে, উন্নয়নের জন্য এই স্থাপনাগুলো প্রয়োজন, তবে বর্জ্য শোধনাগার এবং গরম পানির নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশের সাথে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার পরিবর্তন ইলিশের প্রজনন চক্রকে প্রভাবিত করতে পারে। যদিও এটি এখনই তীব্র সংকটের পর্যায়ে নেই, তবে প্রজনন মৌসুমের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময়কাল পুনর্মূল্যায়ন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এছাড়া মার্চ ও এপ্রিল মাসে কেবল অভয়াশ্রমে নয়, বরং ইলিশের বিচরণ থাকা সব নদীতে জাটকা ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা হিসেবে তিনি ২০০৫ সালে নির্ধারিত অভয়াশ্রমগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণের কথা বলেন। নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং নতুন চর পড়ার ফলে পুরনো অভয়াশ্রমগুলোর কার্যকারিতা কমেছে, তাই বর্তমান বাস্তবতায় সেগুলোর আয়তন নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি। পাশাপাশি, ভারত থেকে ইলিশ আমদানির বিষয়টিকে তিনি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে বরং চাহিদার সমন্বয় হিসেবে দেখার কথা বলেন। তবে ইলিশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে অন্যান্য দেশি মাছের কথা চিন্তা করার আহ্বান জানান তিনি।

পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের জন্য অধ্যাপক ওহাব তিনটি প্রধান পদক্ষেপের কথা বলেছেন: প্রথমত, মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো; দ্বিতীয়ত, জেলে পরিবারগুলোকে কেবল চাল দিয়ে সহায়তা না করে দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করা; এবং তৃতীয়ত, দক্ষিণাঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যদের নিয়মিত বদলি করা। তাঁর বিশ্বাস, এই পদক্ষেপগুলো কার্যকর হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে ইলিশের উৎপাদন ও আকার পুনরায় বৃদ্ধি পাবে।