দেশজুড়ে ডেঙ্গু সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সংক্রমিত শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। সম্প্রতি রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি নিয়ে এক শিশুর পরিবারকে চরম বেগ পোহাতে হয়েছে।
পাঁচ বছরের আলিফা কয়েক দিন ধরে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছে, কথা বলছে না। তার প্লাটিলেট সংখ্যা রোববার নেমে আসে ২৮ হাজারে। বাবা মোহাম্মদ আনোয়ার জানান, শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানানো হয়। চিকিৎসকেরা জানান, অবস্থা গুরুতর, অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। আনোয়ার বলেন, “সেদিন প্রচণ্ড রোদ ছিল, ওর অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে মনে হচ্ছিল বাইরে নিয়ে গেলেই প্রাণ হারাবে।” সারা দিন চেষ্টার পর বিকেলে আলিফাকে ভর্তি করানো সম্ভব হয়।
আলিফার জ্বর শুরু হয় ১০ দিন আগে। ২৮ আগস্ট প্রথম চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে প্লাটিলেট ছিল ৬০ হাজার। পরদিন তা ৩৫ হাজারে নামে এবং রোববার ২৮ হাজারে পৌঁছালে শিশুটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে, রক্তচাপ কমে যায়। বৃহস্পতিবার তাকে রক্ত দেওয়া হয়েছে। বাবার ভাষ্যে, “মেয়েটি অত্যন্ত চঞ্চল, সব সময় কথা বলে। এখন নিশ্চুপ, শুধু শুয়ে তাকিয়ে থাকে। আগে কম খেত, ডেঙ্গু হওয়ার পর থেকে মুখে তুলছে না।”
বেসরকারি চাকরিজীবী আনোয়ার জানান, ভর্তির পর প্রথম চার দিন প্রতিদিন বেড ভাড়া বাবদ ১ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। প্রথম দিনই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় খরচ হয়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকা, সঙ্গে ওষুধ ও খাবারের খরচ। বৃহস্পতিবার থেকে তাকে বিনা মূল্যের বেডে স্থানান্তর করা হয়েছে।
হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও শিশু রয়েছে। চার বছরের মৌ মঙ্গলবার স্কুল থেকে ফিরে মাকে গা ও চোখে ব্যথার কথা জানায়। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলে পরদিন রাতেই ভর্তি করা হয়। মা তাসলিমা বলেন, “শিশুটি এখন খুব জেদি, খেতে চায় না, খেলেও বমি করে। কবে সুস্থ হবে, ভাবতে পারছি না।” এ ছাড়া ১১ মাসের ইয়াসিন চার দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল, বুধবার তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। মা মমতাজ বেগম বলেন, “শিশু কষ্ট বুঝিয়ে বলতে পারে না, সারাদিন কাঁদে। আগের চেয়ে অনেক দুর্বল, শরীরে র্যাশ উঠেছে।”
ভর্তি শিশুদের অনেকেই মিরপুরের বাসিন্দা। মহাখালী, খিলগাঁও, আদাবর, শ্যামলী ও নবীনগর থেকেও শিশুরা এসেছে। অধিকাংশেরই প্লাটিলেট কমে গেছে, জ্বর ও শরীর দুর্বলতা রয়েছে, কারও কারও রক্তচাপ কম। ঢাকার বাইরের রোগীদেরও রাজধানীর হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। নীলফামারী থেকে চার বছরের জিসান এবং চাঁদপুর থেকে পাঁচ বছরের জাহিনকে আনা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে প্রায় ১৬ হাজার — দক্ষিণ সিটিতে ৫ হাজার ২৫১, উত্তরে ৪ হাজার ৭৯৩ এবং দুই সিটির বাইরে ৫ হাজার ৮৪১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ৫১২ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যাদের ২৪০ জন ঢাকা বিভাগের।
হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক মিরাজুল মোহাইমিনা বলেন, “আগে ডেঙ্গু কর্নারে কয়েকটি বেড ভর্তি থাকত, এখন প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।”




