জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়া বলেছেন, নীতি সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নই জাপানি বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ, বাণিজ্য, সম্ভাবনা এবং প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক আস্থা বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে সম্পর্কটি উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ অংশীদারত্বের দিকে এগিয়েছে। মেট্রোরেল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং আড়াইহাজারে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এই অগ্রগতির উদাহরণ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের আকর্ষণীয় দিকগুলো হলো বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ব্যয় এবং কৌশলগত অবস্থান। সম্ভাবনাময় খাতের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, অটোমোবাইল ও যন্ত্রাংশ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, শিল্পযন্ত্রপাতি, লজিস্টিকস, আইসিটি, ওষুধ, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা ও ভোক্তা পণ্য। তবে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল উৎপাদন খরচ কমানো নয়, বরং নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা, ধারাবাহিক মান, সময়মতো সরবরাহ, দক্ষ জনবল এবং পূর্বাভাসযোগ্য নীতি-পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেয়।
জাপানের সবচেয়ে দৃশ্যমান উপস্থিতি অবকাঠামো প্রকল্পে, তবে বেসরকারি খাতে অটোমোবাইল, মোটরসাইকেল, তামাক, তৈরি পোশাক, ভোক্তা পণ্য, যন্ত্রপাতি, ট্রেডিং, লজিস্টিকস, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন খাতে জোরালো অবস্থান। ভবিষ্যতে সম্পর্ক কেবল পণ্য বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাংলাদেশভিত্তিক শিল্প উৎপাদন, আঞ্চলিক সরবরাহকেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে তৃতীয় দেশে রপ্তানির কৌশলগত সুবিধাও জাপানি বিনিয়োগের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠবে।
চীনা গাড়ি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির উত্থানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর দীর্ঘদিনের শক্ত অবস্থান থাকলেও এখন শুধু সুনামের ওপর নির্ভর করে চলা সম্ভব নয়। চীনা ব্র্যান্ডগুলো প্রতিযোগিতামূলক দাম, আকর্ষণীয় ফিচার, সহজ অর্থায়ন ও আধুনিক ইভি প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে। তাই জাপানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে সংযোজন কারখানা, স্থানীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদন, সাশ্রয়ী হাইব্রিড ও ইভি মডেল তৈরির দিকে এগোতে হবে। তবে বিদ্যুৎ গ্রিড এখন ব্যাপক ইভি গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়, সেজন্য বড় বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পথনকশা প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সম্পর্কে তিনি জানান, গত ৬ ফেব্রুয়ারি ইপিএ স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ। এই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ককে সরকারি ঋণ ও প্রকল্পের বাইরে বেসরকারি খাতের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সেবা ও দক্ষ মানবসম্পদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো দিয়েছে। এলডিসি উত্তরণের পর অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা কমে যাওয়ায় ইপিএ সময়োপযোগী। তবে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারই যথেষ্ট নয়; বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাপানি মানের পণ্য সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
ব্যবসা পরিচালনায় জাপানি উদ্যোক্তারা নীতি ও সিদ্ধান্তের পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং সঠিক বাস্তবায়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। কর, ভ্যাট ও কাস্টমস আইনে অসামঞ্জস্যতা, হঠাৎ নীতি পরিবর্তন, এইচএস কোড ও শুল্ক মূল্যায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ভ্যাট রিফান্ডে অতিরিক্ত সময়, বৈদেশিক মুদ্রার অপর্যাপ্ততা, ব্যাংকিং জটিলতা, মুনাফা ফেরত পাঠানোর বাধা, একই নথি একাধিক সংস্থায় জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা, চট্টগ্রাম বন্দরে অতিরিক্ত সময়-ব্য�়, গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাব এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতিকে তিনি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম মেনে চলতে প্রস্তুত, তবে তারা জানতে চায় নিয়মগুলো কতটা স্পষ্ট এবং কত দিন অপরিবর্তিত থাকবে। নতুন প্রণোদনার চেয়ে এই বিষয়গুলো বিনিয়োগ বাড়াতে বেশি সহায়ক।
মাতারবাড়ী বন্দর, মেট্রোরেল, তৃতীয় টার্মিনাল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্পর্কে তিনি বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, বরং অর্থনীতির মোড় ঘোরানোর মতো সমন্বিত অবকাঠামো। মাতারবাড়ী বন্দরে সরাসরি জাহাজ ভেড়ার সুযোগে সময় ও খরচ কমবে। জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিকল্পিত শিল্পভিত্তি দিচ্ছে। মেট্রোরেল রাজধানীর গতিশীলতা বাড়াচ্ছে। তবে মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাজিমা করপোরেশনের মতো বড় ঠিকাদার সরে যাওয়া একটি সতর্কসংকেত। এমন বিলম্ব চলতে থাকলে অন্যান্য জাপানি প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারে। তৃতীয় টার্মিনালের আংশিক কার্যক্রম চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে বলে সরকার জানিয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে দর-কষাকষি চলছে; চুক্তি ও পরিচালন প্রস্তুতি সময়মতো শেষ হলে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পূর্ণাঙ্গ চালু সম্ভব।
জেবিসিসিআই সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই চেম্বার দুই দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও সরকারি সংস্থার মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে ইপিএ ও নিয়মনীতি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, জাপানি বিনিয়োগকারীদের কর, শুল্ক, ব্যাংকিং ও ভিসা সমস্যা কমানো এবং আইটি, চামড়া, ওষুধ ও কৃষিপণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরার কাজ করছে। চেম্বারের মূল লক্ষ্য নতুন বিনিয়োগ আনার পাশাপাশি বিদ্যমান জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্য নিশ্চিত করা, কারণ সন্তুষ্ট বিনিয়োগকারীই নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের সবচেয়ে বড় দূত।




