কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় এক সময় বিস্তৃত ছিল ঘন সুন্দরবন। সেই বনের অস্তিত্ব আজ কেবল স্মৃতিতে। ফাঁসিয়াখালীর নতুন মসজিদ এলাকায় মাত্র একটি সুন্দরী গাছ দাঁড়িয়ে আছে, যা হারিয়ে যাওয়া বনের নীরব সাক্ষী। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল লতিফ জানান, ছোটবেলায় বনে গিয়ে মাছ ধরতেন, গোলপাতা সংগ্রহ করতেন। বাঘ, হরিণ, বানর, কুমির—কত প্রাণী যে দেখতেন। এখন শুধু লবণের ঘের আর মাছের ঘের ছাড়া কিছু নেই।
চকরিয়া সুন্দরবন ছিল উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। ১৯০৩ সালে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পঞ্চাশের দশকে এর আয়তন ছিল প্রায় ২১ হাজার ১০২ একর। কিন্তু ধীরে ধীরে বন উজাড় হতে থাকে। বিশেষ করে সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। ১৯৭৭ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় সংরক্ষিত বনের ৫৬৩ একর জমি ইজারা দেয় স্থানীয় প্রভাবশালী গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর ‘শ্রিম্প অ্যান্ড ডাকারি ফার্ম’কে চিংড়ি চাষের জন্য। এরপর ১৯৮২ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) চিংড়ি চাষে অর্থায়ন শুরু করে। শতাধিক খামার চালু এবং ১৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ১৯৮৬ সালে বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) মাছ চাষ প্রকল্পে ২৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বনের এলাকায় ৫০০টি চিংড়িঘের তৈরি হয়, প্রতিটির আয়তন ১০ একর।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-আমিন বলেন, বন উজাড় করে চিংড়ির ঘের, পরে চিংড়ি চাষে ধস এবং শেষে লবণের ঘের—এটাই চকরিয়া সুন্দরবনের ইতিহাস। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বনের আকার ছিল ১৫ হাজার একরের বেশি, কিন্তু ১৯৯৫ সালে তা নেমে আসে মাত্র ৮৬৬ একরে। বন ধ্বংসের ফলে স্থানীয় প্রায় চার লাখ মানুষ জীবিকা হারিয়েছেন। আগে অন্তত ২০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত, এখন কিছুই নেই। মাটির লবণাক্ততা বেড়ে ৭ দশমিক ৫ ডিএস/এম-এর বেশি হয়েছে, যা কৃষির জন্য ক্ষতিকর।
প্রাকৃতিক বর্ম হিসেবে সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম। গবেষকদের মতে, চকরিয়ার অবস্থান একটি ফানেলের মতো, যেখানে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানত। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছিল। অধ্যাপক আল-আমিন মনে করেন, বনটি থাকলে হয়তো এই ক্ষতি অনেকাংশে রোধ করা যেত। স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল হোসেন বলেন, চকরিয়ার মতো বন ছিল রক্ষাকবচ, কিন্তু তা আর ফিরে আসবে না।
অর্থনৈতিক ক্ষতিও বিশাল। ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগোর অধ্যাপক মো. সারোয়ার হোসেনের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯ হাজার ৭৭৮ একরের বেশি ম্যানগ্রোভ হারিয়ে যাওয়ায় বছরে ন্যূনতম ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার সমমানের প্রতিবেশ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। এছাড়া ম্যানগ্রোভ বন কার্বন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতি হেক্টরে ১৫০ মেগা টন কার্বন সংরক্ষণ করে এই বন। ধ্বংসের ফলে সংরক্ষিত কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনেও প্রভাব পড়ছে।
স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়েছে। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, চকরিয়ায় উচ্চ তাপমাত্রার কারণে গর্ভপাতের ঝুঁকি ২৫ শতাংশ বেশি। চিকিৎসক সালেহ মোহাম্মদ ইকরাম বলেন, শিশুদের শ্বাসকষ্ট, কিডনি রোগ ও ছত্রাক সংক্রমণের হারও বেশি।
বন পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন জানান, ইজারা বাতিল করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিলে বন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে বর্তমানে কোনো উদ্যোগ নেই। ২০২০ সালে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। অধ্যাপক আল-আমিনের মতে, সরকার কঠোর অবস্থান নিলে কয়েক বছর বনকে নিরুপদ্রব রেখে পুনর্বনায়ন সম্ভব।




