যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক নিয়োগ পরীক্ষার বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির প্রায় অর্ধেক চাকরিপ্রার্থী বর্তমানে কোনো না কোনো এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে এখন চাকরির সাক্ষাৎকারের রূপ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইন্টারভিউ বোর্ডে মানুষের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। কম্পিউটারের স্ক্রিনে একের পর এক ভেসে উঠছে আগে থেকে রেকর্ড করা প্রশ্ন। প্রার্থীকে পরখ করার জন্য কোনো মানবিক দৃষ্টি নেই, নেই কথা শুনে প্রতিক্রিয়া জানানোর মানুষও। নিস্তব্ধ ঘরে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে একা একাই নিজের উত্তর রেকর্ড করে জমা দিতে হচ্ছে। এই যান্ত্রিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে চরম বিভ্রান্তি ও হতাশায় ভুগছেন তরুণ চাকরিপ্রার্থীরা।
অনেকেই একের পর এক এমন রোবোটিক সাক্ষাৎকারের পর কাজের আশা ছেড়ে দিচ্ছেন। মানুষের সংস্পর্শ না পাওয়ায় তরুণদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে গভীর অনিশ্চয়তা। এক চাকরিপ্রার্থী তাঁর অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, পুরো ব্যবস্থাটি এখন এতটাই যান্ত্রিক হয়ে গেছে যে সত্যিকার অর্থে যোগ্য ব্যক্তিরা চাকরি পাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যাঁরা শুধু সিস্টেমের ফাঁকফোকর বোঝেন, হয়তো তাঁরাই পার পেয়ে যাচ্ছেন।
এই অনলাইন ও এআইভিত্তিক সাক্ষাৎকার ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন যুক্তরাজ্যের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম। বর্তমান নিয়োগ ব্যবস্থাকে তরুণদের জন্য অত্যন্ত ‘কঠোর’ আখ্যা দিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—এক ঘণ্টার স্ক্রিন দেখে কি কোনো মানুষের আসল গুণ চেনা সম্ভব? তাঁর মতে, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে তরুণদের মূল্যায়ন করা অন্যায়।
তবে অনলাইন সাক্ষাৎকারের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। যেমন, প্রার্থীর যাতায়াত ও থাকার খরচ বেঁচে যায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একই ঘরে মুখোমুখি বসে কথা বলার যে নিজস্ব শক্তি রয়েছে, এআই প্রযুক্তি সেটিকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। তাঁদের মতে, সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে যে মানবিক মূল্যায়ন সম্ভব, তা যন্ত্র কখনোই প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এআইয়ের অদৃশ্য বৈষম্য। অনেকে ভেবেছিলেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো নিরপেক্ষ হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এক ঘটনায় দেখা যায়, এক নারী প্রার্থী নিজের সব তথ্য ঠিক রেখে শুধু বয়স কমিয়ে পুনরায় আবেদন করতেই এআই তাঁকে পরবর্তী ধাপের জন্য নির্বাচন করে ফেলে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, যান্ত্রিক মূল্যায়নেও পক্ষপাতিত্বের ঝুঁকি রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি রিসার্চ’ এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে জানিয়েছে, মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ না পেয়ে নতুন প্রজন্মের তরুণরা নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছেন। প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, তরুণদের মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য মানবিক সংযোগ অপরিহার্য।
যুক্তরাজ্যের এই ধাক্কা হয়তো এখন পৌঁছে যাবে বাংলাদেশেও। দেশের বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাত এবং বড় বড় করপোরেট গ্রুপ এখন অনলাইন সাক্ষাৎকার ও এআই স্ক্রিনিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বাংলাদেশের তরুণেরাও এখন চাকরির আবেদন জমা দেওয়ার পর কোনো মানুষের কাছ থেকে নয়, বরং রোবটের কাছ থেকে পাচ্ছেন যন্ত্রসৃষ্ট প্রত্যাখ্যান বার্তা। সরাসরি কোনো পরামর্শ না পেয়ে তরুণদের মনে তৈরি হচ্ছে তীব্র মানসিক চাপ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়োগের কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার সময় বাঁচাতে পারে ঠিকই। তবে মেধাবী ও যোগ্য মানুষ খুঁজে নিতে সামনাসামনি কথা বলা এবং মানবিক মূল্যায়নের কোনো বিকল্প নেই। যান্ত্রিক দক্ষতা যতই বাড়ুক, মানুষের গুণাগুণ বিচার করতে মানবিক দৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা কখনোই কমবে না। তথ্যসূত্র হিসেবে প্রতিবেদনে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর নাম উল্লেখ রয়েছে।




