জেলার মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বে থাকা পাঁচটি নিরাময় কেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবার ন্যূনতম মান বজায় নেই বলেই পরিদর্শনে ধরা পড়েছে। এসব কেন্দ্রে চিকিৎসক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা তত্ত্বাবধায়ক কেউই নিয়মিত উপস্থিত থাকছেন না। অথচ রোগীদের সংখ্যা অনুমোদিত শয্যার দুই থেকে তিন গুণ। রোগীদের রাখা হচ্ছে চারদেয়ালের ভেতরে, কোনো বিনোদন বা মানসিক বিকাশের ব্যবস্থা ছাড়াই। সম্প্রতি প্রয়াস নামের একটি কেন্দ্রে রোগীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগের পর সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, তবে বাকি পাঁচটি কেন্দ্রে একই ধরনের অনিয়ম চলছে বলে জানা গেছে।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, জেলায় অনুমোদিত ছয়টি নিরাময় কেন্দ্রের মধ্যে দুটি ১০ শয্যার এবং চারটি ২০ শয্যার। ২০ শয্যার কেন্দ্রগুলো হলো প্রয়াস, আশীর্বাদ, প্রত্যয় এবং অশ্রু। ১০ শয্যার কেন্দ্রগুলো হলো প্রত্যাশা এবং বার্তা। তবে সরেজমিনে গত শনি ও রোববার পরিদর্শনে দেখা গেছে, অশ্রু কেন্দ্রে ৬১ জন, প্রত্যয়ে ৪৩ জন, বার্তায় ৪৫ জন এবং প্রত্যাশায় ২৬ জনের বেশি রোগী চিকিৎসাধীন। প্রতিটি কেন্দ্রে চিকিৎসা-পরবর্তী পর্যবেক্ষণে থাকা আরও ২০ থেকে ২৫ জন রোগীও রয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিটি কেন্দ্রেই রোগীর সংখ্যা অনুমোদিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

গত ১৮ আগস্ট রাতে প্রয়াস কেন্দ্রের রোগী মো. ফোরকানকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরদিন এলাকাবাসী কেন্দ্রটিতে ভাঙচুর চালালে সেখানকার ৪০ জন রোগী পালিয়ে যান। পরে ২০ আগস্ট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এন এম কায়সার কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে অনিয়মের প্রমাণ পান এবং চিকিৎসক ছাড়াই সেটি পরিচালিত হচ্ছিল বলে নিশ্চিত হন। বর্তমানে কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে।

পরিদর্শনকালে পাঁচটি কেন্দ্রের কোথাও পূর্ণকালীন চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা ওয়ার্ড বয়ের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ খেলাধুলার ব্যবস্থা, পত্রিকা-ম্যাগাজিন, ক্লাসরুম, পৃথক আবাসন কিংবা খাওয়ার ব্যবস্থাও চোখে পড়েনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রত্যেক কেন্দ্রে সপ্তাহে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সেবা দেন। প্রত্যয় কেন্দ্রে চিকিৎসক ইনজামামুল হক এবং বাকি চারটি কেন্দ্রে চিকিৎসক শাকিল আহমেদ খণ্ডকালীন ভিত্তিতে কাজ করছেন। তবে পরিদর্শনের সময় তাঁদের কাউকেই কেন্দ্রে পাওয়া যায়নি।

মাহমুদুল হাসান বলেন, “জেলায় কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। তাই সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে মনোচিকিৎসক হিসেবে আমি সেবা দিচ্ছি। প্রতিটি কেন্দ্রে সপ্তাহে দুই-তিন ঘণ্টা সময় দিই। ওষুধের পাশাপাশি রোগীদের উৎসাহ দিই।” অন্যদিকে, প্রত্যয় ও প্রত্যাশা কেন্দ্রের পরিচালক জামাল মিয়া জানান, “অনেক অভিভাবক সন্তানদের বেঁধে নিয়ে এসে কান্না করেন। নিরুপায় হয়ে তাদের রাখতে হয়।” অশ্রু কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মোজাম্মেল হক বলেন, “স্থায়ী চিকিৎসক রাখার বাস্তবতা নেই। কারণ একজন রোগীর কাছ থেকে দুই মাসের জন্য ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। স্থায়ী চিকিৎসককে মাসে দেড় লাখ টাকা বেতন দিতে হবে, এত টাকা দিয়ে চিকিৎসক রাখা সম্ভব নয়।”

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাজেদুল হাসান স্বীকার করেছেন যে কেন্দ্রগুলোতে শয্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি। তিনি বলেন, “জেলায় মাদকাসক্তের সংখ্যা বেশি। ১০ ও ২০ শয্যার কেন্দ্র হওয়ায় খণ্ডকালীন চিকিৎসক দিয়েই চলছে চিকিৎসা।” তিনি জানান, পরিদর্শন আরও জোরদার করা হবে এবং নির্যাতনের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ইতিমধ্যে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় কেন্দ্রগুলোর চিকিৎসা পরিবেশ ও মান নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে গেছে।