ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত শুক্রবার রাতে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের বিক্ষোভ মিছিল এবং ক্ষমা চাওয়ার আল্টিমেটামের পর এবার ফেসবুকে বিবৃতি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। শনিবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে দেওয়া বক্তব্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় তিনি বিব্রত এবং দুঃখিত।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে সম্পূরক প্রশ্ন রাখেন হাসনাত। সেখানে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিককরণ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও সিনেমা প্রায় নিষিদ্ধের মতো। হাসনাতের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজ মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনগণ ও আলেম-ওলামাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন এবং বিশ্বের সামনে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন।
ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আরও জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের কনসার্ট বন্ধের ঘটনাটি গণমাধ্যমে যেভাবে প্রচার হয়েছে, প্রকৃত ঘটনা ছিল ভিন্ন। গভীর রাতে উচ্চ শব্দের কারণে মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছিল বলে তারা শব্দ কমানোর অনুরোধ করেছিলেন। সেই অনুরোধকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও পরবর্তী ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। তিনি স্পষ্ট করেন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা কনসার্ট বন্ধ করেনি, তারা কেবল শব্দ কমানোর অনুরোধ জানিয়েছিল। ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ নয় বলে তার বক্তব্য ছিল। তবে নৌকাবাইচ প্রসঙ্গে তিনি সিলেটের স্থলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম বলে ফেলেন, যেটি তার তথ্যগত ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন। এই ভুলের কারণে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে, সেজন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
এনসিপির এই নেতা বলেন, সংসদে তার বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরা। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এমন একটি সর্বজনীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিল যেখানে সব মত ও দৃষ্টিভঙ্গির সহাবস্থান থাকবে এবং কেউ কারও ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেবে না। সরকারের দায়িত্ব হলো সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যায়ভাবে কারও ওপর জোর খাটালে তা প্রতিহত করা। সেই দায়িত্ব পালনে সরকার ব্যর্থ হলে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং জননিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে — এই কথা তিনি সংসদে তুলতে চেয়েছিলেন।
পোস্টের শেষ দিকে হাসনাত বাংলাদেশের বহুত্ববাদী চরিত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি লেখেন, এই দেশে মসজিদ, মন্দির, সঙ্গীত, ওয়াজ, মাজার, কনসার্ট, মাহফিল, রথযাত্রা, সিনেমা উৎসবসহ সব ধর্ম ও মতের সহাবস্থান থাকবে। প্রত্যেকে নিজের পছন্দমতো অংশ নেবে এবং সরকার নিশ্চিত করবে কেউ যেন অন্য কারও অধিকার হরণ করতে না পারে। বর্তমান সরকার সেই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সমতার বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে, হাসনাতের দুঃখ প্রকাশের খবর শেয়ার করে এনসিপির পক্ষ থেকে সেটি ফটোকার্ড আকারে প্রচার করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় এনসিপির কোনো কর্মসূচি হতে দেওয়া হবে না বলে আগেই ঘোষণা দিয়েছিল।




