২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক মহলে এটি বিপ্লব নাকি অভ্যুত্থান—এ নিয়ে বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এই ঘটনাকে এলিট তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। লেখকদের মতে, জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিকে কেবল মতাদর্শ বা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পরিপ্রেক্ষিতে না দেখে প্রতিষ্ঠিত এলিট ও উদীয়মান এলিট-আকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে ক্ষমতা, মর্যাদা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি পুনর্বিন্যাসের প্রতিযোগিতা হিসেবে বোঝা উচিত।
প্রবন্ধটি বলছে, সমাজে যারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবস্থান বা সম্পদের কারণে প্রভাব বিস্তার করে, তারা প্রতিষ্ঠিত এলিট। আর যারা মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে এসে এলিট হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, তারা এলিট-আকাঙ্ক্ষী। সাধারণ মানুষ এই দুই শ্রেণির বাইরে অবস্থান করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় পক্ষেই এই দুই ধরনের এলিটের উপস্থিতি থাকলেও, আকাঙ্ক্ষীদের একটি বড় অংশ বিরোধী রাজনীতিতে পুঞ্জীভূত হয়।
ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মাধ্যমে দেশে দুটি বড় এলিট চক্রাবর্তন ঘটেছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগের নেতারা দেশের এলিট বিন্যাসে একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন করেন। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সেই রুদ্ধ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ১৯৭৫ সালের পরবর্তী অভ্যুত্থানগুলো ছিল সেই এলিট দ্বন্দ্বেরই প্রকাশ।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দ্বিতীয় বৃহৎ এলিট চক্রাবর্তনের সূচনা হয়। দীর্ঘ ১৫ বছরের শেখ হাসিনার রুদ্ধ এলিট বিন্যাস ভেঙে পড়লে সর্বত্র ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। লেখকরা মনে করেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন ১৯৭৩ সালের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত এলিট বিন্যাস তৈরি করেছে।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আকাঙ্ক্ষী এলিটদের সংখ্যা বেড়েছে দ্রুতগতিতে। ২০০০ সালে মধ্যবিত্ত ছিল জনসংখ্যার ১০-১২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নগরায়ণ, প্রযুক্তির বিস্তার, অভিবাসন এবং পাবলিক-প্রাইভেট শিক্ষার বিভাজন আকাঙ্ক্ষী এলিটদের সংখ্যা ও অসন্তোষ বাড়িয়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী রাজনীতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি প্রতিষ্ঠিত ও আকাঙ্ক্ষী উভয় এলিট পরিসরে প্রভাব রাখলেও জামায়াত ও এনসিপি মূলত আকাঙ্ক্ষী এলিটদের প্রতিনিধিত্ব করছে। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির ২৯ শতাংশ প্রার্থীর পারিবারিক সম্পদ ২ কোটি টাকার নিচে, ৪৯ শতাংশের ২-২০ কোটি এবং ২২ শতাংশের ২০ কোটির বেশি। অন্যদিকে জামায়াতের ৭২ শতাংশ প্রার্থী মধ্যবিত্ত, আর এনসিপির ৯৪ শতাংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণির।
লেখকরা বলছেন, বিএনপির বংশানুক্রমিক প্রার্থীরা এলাকায় জনপ্রিয় থাকলেও, দলের বাইরের নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে গেছে। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর দেশ তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও, বঞ্চিত আকাঙ্ক্ষী এলিটদের মধ্যে ক্ষোভ জমা হচ্ছে।
উপসংহারে লেখকরা বলেন, স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য রাজনীতি ও অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ অপরিহার্য। রুদ্ধ এলিট বিন্যাস নতুন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ক্ষমতাসীন এলিটদের যদি সংস্কারের মাধ্যমে উন্মুক্ত কাঠামো গড়তে না পারে, তবে পরবর্তী এলিট আলোড়ন বেশি দূরে নয় বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।




