দেশের ৬৪টি জেলার তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব সম্প্রতি ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং তিন জন জাতীয় সংসদ হুইপের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সুশাসন নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এছাড়া সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তদারকির দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে তাঁদের। সরকারের ভাষ্যমতে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে উন্নয়ন বরাদ্দ থাকলেও ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট ও অর্থ পাচার হয়েছে, যা দমনে এই বিশেষ তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদের বরাত দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, বিশ্লেষকদের মতে, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া না হলেও বাস্তবে তাঁরা 'হর্তাকর্তা' হয়ে ওঠার চেষ্টা করতে পারেন। বিশেষ করে যেসব জেলায় ক্ষমতাসীন দলের কোনো সংসদ সদস্য নেই বা যেখানে বিরোধী দল শক্তিশালী, সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পর্কের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, এই ব্যবস্থার কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং এটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে। তাঁর মতে, অতীতেও এমন ব্যবস্থার কোনো সুফল পাওয়া যায়নি এবং এটি স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সাথে দ্বন্দ্বে পড়ার সুযোগ তৈরি করবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ১৯৯৬-২০০১ সালে শেখ হাসিনা সরকার এবং পরবর্তীতে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করেছিল। তবে ২০০৩ সালে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করলে ২০০৬ সালে আদালত এটিকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। তৎকালীন আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, মন্ত্রীর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব স্থানীয় নির্বাচিত সংসদ সদস্যের কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং প্রশাসনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। এমনকি ২০২১ সালেও করোনা পরিস্থিতির মোকাবিলায় সচিবদের জেলা দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিকে অনেকে বিরোধিতা করেছিলেন।

বর্তমান বিন্যাস অনুযায়ী, কোনো মন্ত্রীকে তাঁর নিজস্ব জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, বরং কাছাকাছি অন্য জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন—পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার দায়িত্ব পেয়েছেন। যদিও তিনি জানিয়েছেন, এটি কেবল সমন্বয়ের কাজ এবং এতে কারও ওপর কর্তৃত্ব করার বিষয় নেই। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও চুয়াডাঙ্গার মতো জেলাগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য থাকলেও সেখানে বিএনপির মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী চুয়াডাঙ্গার দায়িত্ব পেয়েছেন, যেখানে সব সংসদ সদস্যই জামায়াতের। এমন পরিস্থিতিতে মাঠ পর্যায়ে রাজনৈতিক সংঘাত বাড়বে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি, সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকা মন্ত্রীদের এই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন মন্ত্রণালয়ের মূল কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বলেও মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।