আজ ২৫ আগস্ট হলিউডের অন্যতম আলোচিত অভিনেত্রী ব্লেক লাইভলির জন্মদিন। ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্ম নেওয়া এই তারকা ৩৯ বছরে পা দিলেন। অভিনয়, প্রযোজনা, ব্যবসা ও ফ্যাশন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘ইট এন্ডস উইথ আস’ ছবিকে কেন্দ্র করে জাস্টিন বালডোনির সঙ্গে তাঁর আইনি দ্বন্দ্ব তাঁকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
ব্লেকের নাম উচ্চারণ করলেই অনেকের মনে পড়ে যায় ‘গসিপ গার্ল’-এর সেরেনা ভ্যান ডার উডসেনের কথা। নিউইয়র্কের অভিজাত পরিবারের সেই বেপরোয়া, আত্মবিশ্বাসী ও ফ্যাশনসচেতন তরুণীর চরিত্র তাঁকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছিল। কিন্তু সেই পরিচিতি ছাপিয়ে নিজের ক্যারিয়ারকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ব্যক্তিজীবনে হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা রায়ান রেনল্ডসের স্ত্রী এবং চার সন্তানের মা তিনি। অন্যদিকে, ক্যারিয়ারে বিতর্কও পিছু ছাড়েনি তাঁর। বিশেষত ‘ইট এন্ডস উইথ আস’ ছবিকে ঘিরে বালডোনির সঙ্গে দীর্ঘ আইনি লড়াই তাঁর তারকাখ্যাতির আরেকটি দিক তুলে ধরেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে এই বিরোধের বেশিরভাগ আইনি অধ্যায়ের সমাধান হলেও এর প্রভাব এখনো হলিউডে বিদ্যমান।
অভিনয়ের পরিবারেই বেড়ে ওঠা ব্লেকের জন্মনাম ব্লেক এলেন্ডার ব্রাউন। তাঁর বাবা আর্নি লাইভলি ছিলেন অভিনেতা ও পরিচালক, আর মা এলেইন লাইভলি কাজ করতেন ট্যালেন্ট স্কাউট হিসেবে। ভাই এরিক এবং সৎভাই-বোন লরি, রবিন ও জেসন—সবাই বিনোদন জগতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে অভিনয় তাঁর কাছে অচেনা ছিল না। শৈশবে মা-বাবার অভিনয়ের ক্লাসে যাতায়াত করতেন তিনি। তবে ছোটবেলায় অভিনয়কে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে ভাবতেন না ব্লেক; তাঁর ইচ্ছা ছিল স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার পরিচালনায় ‘স্যান্ডম্যান’ ছবিতে পর্দায় অভিষেক হলেও সেটিকে তিনি বড় কোনো ঘটনা হিসেবে দেখেননি।
২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দ্য সিস্টারহুড অব দ্য ট্রাভেলিং প্যান্টস’ ছবিতে ব্রিজেট ভ্রিল্যান্ড চরিত্রে অভিনয় করে তরুণ দর্শকদের নজর কাড়েন। এই ছবির জন্য টিন চয়েজ অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়নও পান তিনি। এরপর ‘অ্যাকসেপ্টেড’ এবং ‘এলভিস অ্যান্ড অ্যানাবেল’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে নিজের সামর্থ্য দেখান। ২০০৭ সালে শুরু হয় ‘গসিপ গার্ল’, যা ২০১২ সাল পর্যন্ত ছয় মৌসুম ধরে চলে। এই সিরিজেই সেরেনা চরিত্রটি পপ-সংস্কৃতির অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয় এবং ব্লেক হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক তারকা। সেরেনার পোশাক, সম্পর্ক, জীবনযাপন—সবকিছুই তখন তরুণদের আগ্রহের বিষয়। সেই সময়েও সিনেমা থেকে দূরে ছিলেন না তিনি; ‘দ্য সিস্টারহুড অব দ্য ট্রাভেলিং প্যান্টস ২’, ‘দ্য টাউন’-এর মতো ছবিতে কাজ করেন।
২০১১ সালে ‘গ্রিন ল্যান্টার্ন’ ছবির সেটেই রায়ান রেনল্ডসের সঙ্গে পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে বিয়ে করেন তাঁরা। আজ এই দম্পতি হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত জুটি। তাঁদের চার সন্তান—তিন মেয়ে ও এক ছেলে। ‘গসিপ গার্ল’ শেষ হওয়ার পর ব্লেক নিজেকে চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। ২০১৫ সালের ‘দ্য এজ অব অ্যাডালিন’ এবং ২০১৬ সালের ‘দ্য শ্যালোস’ তাঁর ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কাজ। ‘দ্য শ্যালোস’-এ হাঙরের আক্রমণ থেকে বাঁচতে সংগ্রাম করা এক সার্ফারের চরিত্রে প্রায় একাই ছবির বড় অংশ টেনেছেন তিনি। ২০১৮ সালের ‘আ সিম্পল ফেভার’-এ রহস্যময় ও ফ্যাশনসচেতন এমিলি নেলসন চরিত্রটি বিশেষ প্রশংসিত হয়। ২০২৫ সালে এর সিক্যুয়েল ‘অ্যানাদার সিম্পল ফেভার’-এও তাকে দেখা যায়।
শুধু অভিনেত্রীই নন, ২০১৪ সালে তিনি ‘প্রিজার্ভ’ নামে একটি ডিজিটাল ম্যাগাজিন ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম চালু করেছিলেন। তবে এক বছরের বেশি সময় পর ২০১৫ সালে সেটি বন্ধ করে দেন। এই উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল; একটি ফ্যাশন সম্পাদকীয়তে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধ-পূর্ব দক্ষিণাঞ্চলের নান্দনিকতা ব্যবহার করায় দাসপ্রথার ইতিহাসকে রোমান্টিকভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ ওঠে। ২০২১ সালে তিনি ‘বেটি বাজ’ নামে নন-অ্যালকোহলিক ড্রিংক মিক্সার ব্র্যান্ড চালু করেন এবং পরে পানীয় ব্যবসায়ও যুক্ত হন।
রায়ান রেনল্ডসের সঙ্গে ব্লেকের বিয়ের স্থান দক্ষিণ ক্যারোলাইনার বোউন হল প্লান্টেশন নিয়েও সমালোচনা হয়েছিল, কারণ জায়গাটির সঙ্গে দাসপ্রথার ইতিহাস জড়িত। ২০২০ সালে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এলে তাঁরা প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এনএএসিপি লিগ্যাল ডিফেন্স অ্যান্ড এডুকেশনাল ফান্ডে দুই লাখ ডলার অনুদান দেন।
২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ইট এন্ডস উইথ আস’ ছবিটি ছিল তাঁর জীবনের বাঁক। কলিন হুভারের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে লিলি ব্লুম চরিত্রে অভিনয় করেন ব্লেক, আর পরিচালক ও সহশিল্পী ছিলেন জাস্টিন বালডোনি। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলেও দুই তারকার সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। ব্লেক অভিযোগ করেন, সেটে বালডোনির আচরণ বৈরী কর্মপরিবেশ তৈরি করেছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সিভিল রাইটস বিভাগে অভিযোগ করেন এবং পরে ফেডারেল আদালতে মামলা করেন। বালডোনি অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা মামলা করেন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৬ সালের এপ্রিলে আদালত ব্লেকের ১৩টি দাবির মধ্যে ১০টি খারিজ করে দেয়, যার মধ্যে যৌন হয়রানির অভিযোগও ছিল। মে মাসে অবশিষ্ট দাবিগুলো আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। অন্যদিকে, বালডোনির নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মামলাও খারিজ হয় এবং তাঁকে সংবাদপত্রটির আইনি খরচ বাবদ ১ লাখ ৭১ হাজার ৬১৬ ডলারের বেশি দিতে বলা হয়।
২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, ব্লেকের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৬৬-৩৬৯ কোটি টাকা। তবে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ আর রায়ানের সঙ্গে যৌথ সম্পদ এক নয়। রায়ানের সম্পদ প্রায় ৩৫ কোটি ডলার। ফলে দম্পতির সম্মিলিত সম্পদের হিসাব প্রায় ৩৮ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি। তবে এসবই বিভিন্ন বেসরকারি হিসাবের অনুমান; নিরীক্ষিত পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে নেই।
ব্লেক লাইভলির ক্যারিয়ার তাই শুধু সিনেমার তালিকা দিয়ে বোঝানো যায় না। ‘গসিপ গার্ল’-এর সেরেনা তাঁকে খ্যাতি দিলেও সেই পরিচয়ের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা তিনি করেছেন বারবার—অভিনেত্রী, প্রযোজক, ব্যবসায়ী বা ফ্যাশন আইকন হিসেবে। টেইলর সুইফটের ‘আই বেট ইউ থিঙ্ক অ্যাবাউট মি’র মিউজিক ভিডিও পরিচালনাও তাঁর সৃজনশীল পরিসর বাড়ানোর উদাহরণ। তবে খ্যাতির সঙ্গে বিতর্কও এসেছে; ব্যবসায়িক উদ্যোগের সমালোচনা, বিয়ের ভেন্যু নিয়ে বিতর্ক, কাজের পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ—সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলো ব্লেকের জন্য বেশ ঘটনাবহুল ছিল।




