রিয়েলিটি শোয়ের জগতে সাধারণত প্রতিযোগীদের লক্ষ্য থাকে জয়। কিন্তু ‘দ্য ট্রেইটর্স’-এ খেলার ধরন একেবারে ভিন্ন। এখানে কে সত্যি বলছে, আর কে মিথ্যা — এই চেনার লড়াইটাই মুখ্য। নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাই এখানে সবচেয়ে বড় অস্ত্র, কারণ কেউ বন্ধুর ছদ্মবেশে শত্রুও হতে পারে। দ্বিতীয় মৌসুমে এই সন্দেহের খেলা আরও জোরালো হয়েছে। গত ১৩ আগস্ট প্রাইম ভিডিওতে মৌসুমটি শুরু হয়েছে, প্রথম সিজনের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সঞ্চালক হিসেবে আছেন করণ জোহর। ২১ জন পরিচিত মুখ — বলিউড, টেলিভিশন, সংগীত, কমেডি ও ডিজিটাল জগতের তারকারা — এবারের প্রতিযোগীদের তালিকায় রয়েছেন। মল্লিকা শেরাওয়াত, মুনাওয়ার ফারুকি, রিয়া চক্রবর্তী, শ্বেতা তিওয়ারি, শালিনী পাসি, অভিষেক মালহান, কৃষ্ণা দ’সুজা, পারুল গুলাটি, রণবীর ব্রার, দালিপ তাহিল — এমন অনেকেই আছেন এবার। তবে শোটি কেবল খেলার জন্যই আলোচনায় নেই; পর্দার বাইরের ঘটনাও দর্শকদের নজর কাড়ছে। অতিরিক্ত কৌশলের অভিযোগ, কারও আচরণ নিয়ে প্রশ্ন, এমনকি পোশাক নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে শোটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্কের একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এই শোটির মূল কাঠামো আপাতদৃষ্টিতে সহজ হলেও মানসিকভাবে এটি অত্যন্ত জটিল। কিছু প্রতিযোগী গোপনে ‘ট্রেইটর’ হিসেবে নির্বাচিত হন, বাকিরা থাকেন ‘ইনোসেন্ট’। ইনোসেন্টদের কাজ ট্রেইটরদের চিহ্নিত করে খেলা থেকে বের করে দেওয়া, আর ট্রেইটরদের লক্ষ্য পরিচয় গোপন রেখে বাকিদের নির্মূল করা। এখানে শারীরিক দক্ষতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও মানুষ চেনার ক্ষমতা। শোটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ‘সার্কেল অব শক’-এ প্রতিযোগীরা একে অপরের বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং ভোটে কাউকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সমস্যা হলো, নির্দোষ কাউকে বাদ দিলে আসল ট্রেইটররা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় মৌসুমের শুরুতেই মুনাওয়ার ফারুকি আলোচনার কেন্দ্রে। প্রথম ‘সার্কেল অব শক’-এ তিনি মল্লিকা শেরাওয়াতকে ট্রেইটর বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন, কিন্তু পরিস্থিতি তার বিপক্ষে যায়। অন্য প্রতিযোগীদের অনেকেই মুনাওয়ারের আচরণকে সন্দেহজনক মনে করেন এবং তিনিই প্রথম বাদ পড়েন। এই ঘটনা শোটির মূল দর্শনকে সামনে আনে — আপনি যদি খুব বেশি সন্দেহ প্রকাশ করেন, অন্যরা আপনাকেই সন্দেহ করতে শুরু করে। বাদ পড়ার পর মুনাওয়ার অন্য প্রতিযোগীদের ‘ইনসিকিউর’ বলে আক্রমণ করেন এবং দাবি করেন, তাকে শুরু থেকেই টার্গেট করা হয়েছিল। অর্থাৎ খেলা শেষ হওয়ার পরও সামাজিক মাধ্যমে প্রতিযোগীদের মধ্যে বাক্যবাণ চলতে থাকে।

সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় বিতর্ক অবশ্য অভিনেত্রী ও উদ্যোক্তা পারুল গুলাটিকে ঘিরে। শুরুতে ট্রেইটর শনাক্তে তার আত্মবিশ্বাস দর্শকদের নজর কাড়ে। হারমান সিংহাকে তিনি সন্দেহ করেছিলেন এবং সেই সন্দেহ সঠিকও প্রমাণিত হয়। পরে কৃষ্ণা দ’সুজাকেও সন্দেহ করেন তিনি। কিন্তু পারুল নিজে যখন বাদ পড়েন, গল্পটি অন্য মোড় নেয়। বাদ পড়ার পর পারুল তার সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায্য’ বলে মন্তব্য করেন। এরপর কৃষ্ণা দ’সুজা ও শাহনিল গিল অভিযোগ তোলেন, পারুল খেলার বাইরে থেকে তথ্য পেয়েছিলেন — এমনকি ট্রেইটরদের পরিচয় জানার জন্য অর্থ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। তবে এগুলো সহপ্রতিযোগীদের অভিযোগ, প্রমাণিত সত্য নয়। এই অভিযোগ শোটির একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে — একটি খেলায় ‘জেতার কৌশল’ আর ‘প্রতারণা’-র সীমারেখা কোথায়? অভিযোগ সত্য হলে খেলার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, আর মিথ্যা হলে একজন প্রতিযোগীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়াও সমান সমস্যার।

মল্লিকা শেরাওয়াত ও শালিনী পাসিকে ঘিরে আরেকটি আলোচিত ঘটনা তৈরি হয়েছে পোশাক নিয়ে। মল্লিকার পরা একটি পোশাক সত্যিই ডলচে অ্যান্ড গাব্বানার কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন শালিনী। বিষয়টি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মল্লিকা অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, তিনি এটিকে ‘ঈর্ষা’ হিসেবে দেখছেন। শো শুরুর আগেও মল্লিকাকে ঘিরে আরেকটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। লঞ্চ অনুষ্ঠানে শ্বেতা তিওয়ারির ছবি তোলার সুবিধার জন্য মল্লিকাকে সরে যেতে বলা হয়েছিল বলে দাবি ওঠে এবং ‘অপমানিত’ হওয়ার আলোচনা শুরু হয়। তবে ভাইরাল ক্লিপকে পুরো ঘটনার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।

শোটির নাটকীয়তার বড় অংশ আসে সঞ্চালক করণ জোহরের কাছ থেকে। তিনি শুধু নিয়ম ঘোষণা করেন না; প্রতিযোগীদের মানসিক চাপ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তারকাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচিতির জায়গা থেকে তিনি কথা বলতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে অস্বস্তিকর প্রশ্নও করতে পারেন। প্রথম মৌসুমে ২০ জন প্রতিযোগী অংশ নিয়েছিলেন এবং নিকিতা লুথার ও উরফি জাভেদ যৌথভাবে বিজয়ী হয়েছিলেন। দ্বিতীয় মৌসুমে প্রতিযোগীদের পরিচিতি আরও বৈচিত্র্যময়, ফলে মানসিক সংঘাতও ভিন্ন মাত্রা পাচ্ছে।

বিতর্ক তৈরি হওয়ার একটি বড় কারণ হলো — এই শোতে বিতর্ক নিজেই বিনোদনের অংশ। একজন প্রতিযোগীর সন্দেহ শুধু খেলার সিদ্ধান্ত নয়, দর্শক তার কারণ জানতে চান। আর সন্দেহের জবাবে প্রতিযোগীর দেওয়া ব্যাখ্যাই তাকে আরও সন্দেহজনক করে তুলতে পারে। এর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। একটি ক্লিপ মুহূর্তে ভাইরাল হয়, দর্শক সেই ক্লিপ দেখে সিদ্ধান্ত নেন কে ‘ভালো’, কে ‘খারাপ’। শো থেকে বের হয়ে প্রতিযোগীরা নিজেদের বক্তব্য দেন, ফলে খেলাটি ইনস্টাগ্রাম বা এক্স-এ গড়ায়। শ্বেতা তিওয়ারি সম্প্রতি নারীদের বিরুদ্ধে কটূক্তি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রশ্ন উঠছে, পুরুষ প্রতিযোগীর ‘আগ্রাসী খেলা’কে কৌশল হিসেবে দেখা হলেও নারীদের একই আচরণকে কেন ব্যক্তিগত চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়? ‘দ্য ট্রেইটর্স ২’-এর আসল মজা এই অনিশ্চয়তায়। এখানে কেউ পুরোপুরি নির্দোষ নয়, আবার শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে দোষী বলাও যায় না। আজকের সবচেয়ে কাছের মিত্রই কালকে খেলা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করতে পারে। এই খেলায় সবচেয়ে দামি জিনিস টাকা নয় — বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস ভাঙলেই শুরু হয় আসল খেলা।