অস্ট্রেলিয়ার অফিসিয়াল মিউজিক চার্টে এবার থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি গান আর স্থান পাবে না। দেশটির রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (এআরআইএ) জানিয়েছে, এই সপ্তাহ থেকে চার্টে জায়গা পেতে হলে গানটিকে অবশ্যই 'মানবসৃষ্টভাবে যথেষ্ট' হতে হবে। সংস্থাটি বলছে, এই নতুন নিয়ম শিল্পের 'মানবিক শৈল্পিকতার' দিকটি তুলে ধরতে সহায়তা করবে।

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান ডিজে জোশ ফাওয়াজের ম্যাডোনার 'লাইক আ প্রেয়ার' গানের একটি কভার সংস্করণ এআরআইএ-র ড্যান্স সিঙ্গেলস চার্টের শীর্ষে ওঠে এবং দেশটির সামগ্রিক চার্টে দ্বিতীয় স্থান দখল করে। গানটি বাণিজ্যিক রেডিও স্টেশনগুলোর প্লেলিস্টে নিয়মিত স্থান পায় এবং শুধু স্পটিফাইতে ৪৮ মিলিয়নের বেশি বার স্ট্রিম হয়। পরে সমালোচনার মুখে ফাওয়াজ গানটিতে জেনারেটিভ এআই-এর ব্যবহারের কৃতিত্ব যুক্ত করেন। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটেই নতুন এই সিদ্ধান্ত এল।

এআরআইএ মনে করছে, 'ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে' অস্ট্রেলিয়ান শিল্পীরা মনোযোগ আকর্ষণের জন্য লড়ছেন। সংস্থাটির বক্তব্য, 'মানব শৈল্পিকতা নেই' এমন এআই-নির্মিত গানের সাফল্য উদযাপন বা প্রচার করতে তারা আগ্রহী নয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গান তৈরিতে এআই-এর সহায়তা নেওয়া যাবে, তবে গানের কথা লিখতে হবে মানুষকে, কণ্ঠ দিতে হবে মানুষের, আর মূল বাদ্যযন্ত্রও বাজাতে হবে মানুষের দ্বারা। গান মাস্টার করার সময় বা ড্রাম মেশিন ও অটোটিউনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের অনুমতি থাকছে।

এদিকে, এ বছরের শুরুতে সুইডেনের মিউজিক চার্ট থেকেও একটি এআই-নির্মিত গান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক ফোনোগ্রাফিক ইন্ডাস্ট্রি ফেডারেশন (আইএফপিআই) ঘোষণা করে যে লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অফিসিয়াল চার্টে এআই নির্দেশিকা চালু করা হবে। আইএফপিআই-এর নির্দেশনার ভিত্তিতে আপডেট হওয়া এই নতুন নিয়মে 'স্ট্রিম বা চার্ট ম্যানিপুলেশন' নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে এমন সঙ্গীতকেও বাদ দেওয়া হচ্ছে।

এআরআইএ-র প্রধান নির্বাহী অ্যানাবেল হার্ড বলেছেন, এই পরিবর্তনগুলো দ্রুত বিকশিত একটি ক্ষেত্রে সংস্থাটি গতিশীল থাকতে এবং শৈল্পিকতার মানবিক দিকটিকে তুলে ধরতে চায়। তিনি উল্লেখ করেন, শিল্পীরা তাদের কাজে এআই টুলস ব্যবহার করছেন, চার্টে সেই জায়গাটুকু রাখার জন্য বিবর্তিত হওয়া উচিত। তবে শিল্পীদের রেকর্ডিংয়ের ভিত্তিতে তৈরি পরিষেবাগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে উৎপন্ন সংগীত একটি ভিন্ন বিষয়। একটি চার্ট যদি অননুমোদিত এআই আউটপুটকে পুরস্কৃত করে, তবে তা রেকর্ড করা সংগীতের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করবে, যা প্রতিনিধিত্ব করার জন্যই সংস্থাটি বিদ্যমান।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, চার্টে গান জমা দেওয়ার সময় শিল্পীদের এআই ব্যবহারের বিষয়টি ঘোষণা করতে হবে। পরে যদি দেখা যায় যে একটি গান মূলত এআই-নির্মিত, তবে এআরআইএ পূর্ববর্তীভাবে চার্টের অবস্থান সংশোধন করতে পারবে। এমনকি গানটি যদি শীর্ষে পৌঁছে থাকে, তবে প্রথম স্থান অর্জনের জন্য দেওয়া পুরস্কার ফেরত চাওয়া হতে পারে। তবে শিল্পী এবং তাদের প্রতিনিধিরা এই বর্জনের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ পাবেন।

অস্ট্রেলিয়ান ইলেকট্রনিক অ্যাক্ট পিকিং ডাক এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে। গত মাসে তারা তাদের ২০১৪ সালের হিট গান 'হাই'-এর একটি এআই-সহায়ক সংস্করণ ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেছিল, যার ক্যাপশনে লেখা ছিল, 'যখন আপনি আপনার নিজের গান এআই দিয়ে রেকর্ড করেন যাতে অস্ট্রেলিয়ান রেডিও এটি বাজায়'। ব্যান্ড সদস্য অ্যাডাম হাইড চ্যানেল নাইন-এর টুডে শো-তে বলেছেন, এআই-নির্মিত সংগীত 'জীবন থেকে মানুষের অভিজ্ঞতা দূর করছে'।

গত বছরের জুলাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিয়েটিভদের জন্য এআই থেকে 'সবচেয়ে শক্তিশালী সম্ভাব্য সুরক্ষা' দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, লেখক এবং সংগীতশিল্পীরা তাদের কাজ এআই প্রশিক্ষণে কীভাবে ব্যবহৃত হবে তা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। ক্রিয়েটিভরা যদি সেই নিয়ন্ত্রণ হারান এবং এর ব্যবহারের জন্য অর্থ না পান, তবে সেটি 'চুরি' হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।